বাসস
  ২৮ জুন ২০২৬, ১২:২৬
আপডেট : ২৮ জুন ২০২৬, ১২:৩৫

সরকারি সেবা নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জোরালো হচ্ছে ডিজিটাল রূপান্তর

প্রতীকী ছবি। পেক্সেলস

ঢাকা, ২৮ জুন, ২০২৬ (বাসস): স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগসেবাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবাকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজলভ্য করে নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ দ্রুতগতিতে বৃহৎ ডিজিটাল রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় এ রূপান্তরের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এর আওতায় চালু হচ্ছে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি, অনলাইন সামাজিক সুরক্ষা প্ল্যাটফর্ম, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত ব্যবস্থা, ডিজিটাল বিনিয়োগসেবা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি সহায়তা। এসব উদ্যোগের ফলে কাগজপত্রের ব্যবহার কমবে এবং ঘরে বা কর্মস্থলে বসেই সরকারি সেবা পাওয়া আরও সহজ হবে।

স্বাস্থ্য খাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সব নাগরিকের জন্য ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে। এই ডিজিটাল কার্ড সমন্বিত রোগী ব্যবস্থাপনা (ইন্টিগ্রেটেড পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) ও রেফারেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। ফলে দেশের যেকোনো প্রাথমিক, মাধ্যমিক বা বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রেসক্রিপশন ও অন্যান্য চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে।

সম্প্রতি বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এর মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর আগের চিকিৎসা, পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে। এতে চিকিৎসার মান উন্নত হবে, চিকিৎসাগত ভুল ও অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্ত প্রেসক্রিপশন কমবে। রোগীরা আরও দ্রুত, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সেবা পাবেন।’

এছাড়া দেশের ২২টি নিউক্লিয়ার মেডিসিন ইনস্টিটিউটকে একটি অনলাইন নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে সমন্বিত নিউক্লিয়ার মেডিসিন তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

শিক্ষা খাতেও প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষকদের প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ, ফ্রী ওয়াই-ফাই, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি এবং ডিজিটাল লাইব্রেরির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, ফ্রী ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণ, প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য স্বতন্ত্র এডু-আইডি চালু, ডিজিটাল লাইব্রেরি স্থাপন এবং শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, কোডিং ও ডিজিটাল সাক্ষরতার সঙ্গে পরিচিত করানো হবে।’

সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হচ্ছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় মোবাইল আর্থিক সেবা ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরকার থেকে সরাসরি (জি-টু-পি) ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

একই সঙ্গে ‘ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’র মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য আবেদন করা যাবে। প্রায় ৪ কোটি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’ তৈরি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া রোধ করা হবে এবং লক্ষ্যভিত্তিক সেবা নিশ্চিত হবে।

বিনিয়োগ ও ব্যবসাসেবাও ডিজিটাল হচ্ছে। ‘ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত আবেদন, যাচাই ও লাইসেন্স প্রদানসহ সব সেবা অনলাইনে পাওয়া যাবে। আবেদন সম্পন্ন হওয়ার সাত দিনের মধ্যে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ব্যবসা সহজ করতে চালু হয়েছে ‘বাংলাবিজ’ নামের সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এটি দ্রুত, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য অনুমোদন নিশ্চিত করবে। রপ্তানিকারকেরা ‘বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অনলাইনে ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (সিওও) ও সংশ্লিষ্ট সেবা পাবেন। কোম্পানির নাম ছাড়পত্র ও নিবন্ধনও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইনে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাণিজ্য সহজ করতে বিজনেস সিঙ্গেল উইন্ডো (বিএসডব্লিউ) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন (সিওও) প্রদানসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণসংক্রান্ত সেবা রপ্তানিকারকদের অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে।’

রাজস্ব ব্যবস্থাপনাও ডিজিটাল হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) স্বয়ংক্রিয় ও ‘ফেসলেস’ কর ফেরত ব্যবস্থা চালু করছে। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত পরিশোধিত কর সরাসরি করদাতার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে।

একই সঙ্গে ই-রিটার্নের মাধ্যমে আয়কর দাখিল এবং ই-ভ্যাটের মাধ্যমে ভ্যাট রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে করদাতাদের কর অফিসে যেতে না হয়। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি রাজস্ব সরাসরি জমা দেওয়ার জন্য ‘এ-চালান’ ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।

কৃষি খাতেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিকভাবে ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে ডিজিটাল সেবা দেওয়া হবে। ‘কৃষকের অ্যাপ’-এর মাধ্যমে দেশের সব উপজেলায় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করা হবে। পাশাপাশি নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণের জন্য ‘ফুড-ফ্রেন্ডলি ডিস্ট্রিবিউশন অ্যাপ’-এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান খাতেও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। ‘প্রবাসী কার্ডে’ কর্মীদের ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষিত থাকবে। এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় দ্রুত ও নিরাপদে রেমিট্যান্স পাঠানো সম্ভব হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রবাসী কর্মীদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হচ্ছে। এতে কর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষিত থাকবে। কার্ডটি ব্যাংক পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, যাতে রেমিট্যান্স পাঠানো আরও সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ হয়।’

বিদেশে কর্মসংস্থানের পুরো প্রক্রিয়া ‘ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে ডিজিটাল করা হয়েছে। 

পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের তথ্য একীভূত করতে ‘লেবার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ গড়ে তোলা হচ্ছে।

পরিবেশ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। বনসৃজন তদারকিতে ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ড্যাশবোর্ড, জ্বালানি সরবরাহে ২ হাজার ৭০০টির বেশি ট্যাংক লরিকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও এসএমএসভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে এসব উদ্যোগ সরকারি প্রশাসনে প্রযুক্তিনির্ভর সেবাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে দেশের অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তথ্য ব্যবস্থাপনা, সেবা প্রদান এবং নাগরিকদের জন্য সরকারি সেবা আরও সহজলভ্য করতে ক্রমেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।