শিরোনাম

মুহাম্মদ আমিনুল হক
সুনামগঞ্জ, ২১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : মেঘ পাহাড়ের দেশ সুনামগঞ্জ। এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজের ওপর নির্ভরশীল। জেলায় বোরো ধানের পাশাপাশি মৌসুমি ফসলের চাষাবাদ করেন কৃষকরা। আনারস, আম, কাঁঠাল ও বাদামসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে অনেক কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আর এরই ধারাবাহিকতায় জেলার হাসাউরায় আনারস চাষে লাভবান হচ্ছেন কৃষকরা। দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখছেন জেলার কৃষকরা।
জেলা শহরের সীমান্তবর্তী এলাকা রঙ্গারচর ইউনিয়নের হাসাউড়া, রসুলপুর ও দর্পগ্রাম। এছাড়াও অর্থনীতির চালিকাশক্তি হলো হাসাউড়া, পেচাকোনা ও বনগাঁও গ্রাম। এ সব গ্রামের মানুষ আনারস চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আর দেশের অর্থনীতির চাকাও ঘুরবে এইসব কৃষকদের মাধ্যমে।
সীমান্তের পূণ্যনগর এলাকায় পাহাড়ি জনপদের বসবাস। এখানে খাসিয়া সসম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন।
পাশেই ছোট ছোট পাহাড়ে সবুজের সমারোহ। আর এ সব পাহাড়ের সবুজ টিলায় শুধু আনারসের বাগান।
বছরের পর বছর ধরে এ অঞ্চলের কৃষকরা চাষ করে আসছেন বিশেষ এক জাতের আনারস। যা স্বাদ, গন্ধ ও গুণগত মানের কারণে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুস্বাদু ফলের পরিচিতি পেয়েছে। ‘হাসাউড়ার আনারস’ নামে বিশেষ খ্যাতি রয়েছে এ অঞ্চলে উৎপাদিত আনারসের।
‘হাসাউড়ার আনারস’ জেলা ছাড়িয়ে দেশের অন্যান্য জেলায়ও এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী সঠিক উদ্যোগ নেয়া হলে বিদেশেও রপ্তানি’র উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে এ ‘হাসাউড়ার আনারস’র ।
বর্ষা মৌসুমের এ সময় হাসাউড়ার আশপাশে আনারসের ম-ম গন্ধ ছড়ায়। ক্রেতাÑবিক্রেতার উপস্থিতিতে মুখর হয় টিলাগুলো। মে মাস থেকে বাগানে ফল সংগ্রহ শুরু হয়। বিক্রির ব্যস্ততা বাড়ে জুন মাসে। পুরো মাসেই এই ব্যস্ততা থাকে। এ মৌসুমে ভোর থেকেই চাষীরা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাগানে পাকা আনারস সংগ্রহ শুরু করে বিকেল পর্যন্ত সংগ্রহ ও বিক্রয় চলে।
হাসাউড়ার আনারসের গন্ধই আলাদা, অতুলনীয় স্বাদ মধুরমত মিষ্টি। ‘হানিকুইন’ জাতের এই আনারসে আঁশের পরিমাণ কম, রস বেশি এবং স্বাদে গন্ধে অনন্য। একবার খেলে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুখে এর স্বাদ লেগে থাকে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই আনারসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
আনারস চাষি নিতাই চন্দ্র দাসের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, হাসাউড়ার আনারসের স্বাদ ও গুণগত মান খুবই ভালো। এটি মিষ্টি, সুস্বাদু ও রসালো। বাজারে হাসাউড়ার আনারসের নাম শুনলেই ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে ক্রয় করেন। বাগানে আনারস পুরোপুরি পেকে গেলেই আমরা সংগ্রহ শুরু করি।
তিনি জানান, প্রতিবছর মে মাস থেকে আনারস পাকতে শুরু করে এবং জুন মাস পর্যন্ত বিক্রয় চলে।
চাষীরা জানান, একটি ভালো মানের আনারস উৎপাদনের জন্য দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পরিশ্রম করতে হয়। চারা রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সেচ ও পরিচর্যাসহ প্রতিটি ধাপে বিশেষ যতœ প্রয়োজন। এতে বাড়তি খরচ বলতে শুধু শ্রমিকের মজুরি।
আনারস চাষি ইসলাম উদ্দিন বললেন, এবার আনারসের ফলন ভালো হয়েছে। হাসাউড়ার আনারস দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। যারা একবার এ আনারস খায়, তারা বার বার এর খোঁজে আসেন।
রাসায়নিক সার ব্যবহারের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা আনারস চাষে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না।
মূলত আগাছা পরিষ্কার করা এবং বাগানের নিয়মিত পরিচর্যাই আমাদের কাজ। প্রাকৃতিক পরিবেশেই আনারস বড় হয় এবং এর স্বাদ ও গুণগত মান বজায় থাকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, কৃষকদের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ফল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আনারসের উৎপাদন আরও বাড়বে। একইসঙ্গে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং এ অঞ্চলের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হবে।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মামুন মল্লিক বললেন, আমরা প্রতিবছর হাসাউড়ার আনারস খেতে আসি। নিজেরা খাওয়ার পাশাপাশি বাড়ির জন্যও নিয়ে যাই। এমন স্বাদের আনারস অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
জেলার দোয়ারাবাজারের লক্ষীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল হক বলেন, হাসাউড়ার পাশে লক্ষীপুর ইউনিয়নে আরও কিছু টিলায় আনারস চাষের উপযোগী ভূমি রয়েছে। বিশেষ করে মাঠগাঁও এবং এর আশপাশের এলাকা। কৃষি অফিস উদ্যোগী হলে ওখানেও চাষীদের দিয়ে আনারস চাষ করানো যেতে পারে বলে তিনি বলেন।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাসিন্দা মো. বুরহান উদ্দিন বলেন, হাসাউড়ায় বর্তমানে যে পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হচ্ছে, তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এ আনারস মূলত টিলাভূমিতে চাষ করা হয়।
রঙ্গারচর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বলেন, এ সব এলাকায় এখনও অনেক টিলা পতিত অবস্থায় রয়েছে। কৃষকরা যদি প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা ও প্রণোদনা পান, তাহলে এসব পতিত টিলায় আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করে উৎপাদন করা সম্ভব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হাসাউড়া এলাকায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারসের চাষ হয়েছে। উৎপাদিত আনারসের মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা এসে সরাসরি বাগান থেকে সংগ্রহ করছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে মিষ্টি ও রসালো ফলের চাহিদা থাকায় হাসাউড়ার আনারস রপ্তানিরও যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা ওমর ফারুক বাসস’কে বলেন, হাসাউড়া এলাকার বিভিন্ন টিলায় প্রায় ৩০ হেক্টর জমিতে হানিকুইন জাতের আনারসের আবাদ হয়েছে। এই জাতের আনারস অত্যন্ত সুমিষ্ট ও সুস্বাদু হওয়ায় সারাদেশে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আনারস চাষে স্থানীয় কৃষকদেরও যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বাজারে এই আনারসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বাসস’কে বলেন, হাসাউড়ার আনারসকে জিআই পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করার প্রয়োজনীয় সকল উদ্যোগই নেয়া হবে। হাসাউড়ার আনারস চাষে আরও বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।