বাসস
  ২১ জুন ২০২৬, ১৮:৪২

গাজীপুরের সাদ্দাম হোসেনের একটি গাভি থেকে এখন বিশাল খামার

ছবি : বাসস

 মুহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ

গাজীপুর, ২১ জুন, ২০২৬ (বাসস) : পরিশ্রম, সততা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে সফলতার চূড়ায় পৌঁছানো সম্ভব, তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গাজীপুর মহানগরীর পূবাইল থানার হায়দরাবাদ গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা মো. সাদ্দাম হোসেন। 

মো. সাদ্দাম হোসেন মাদ্রাসা থেকে আলেম (উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করার পর প্রচলিত চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি বেছে নিয়েছেন স্বাবলম্বী হওয়ার এক ব্যতিক্রমী পথ। তার এই সাহসিকতার গল্প আজ এলাকার শত শত তরুণের জন্য এক নতুন অনুপ্রেরণার উৎস।

সাদ্দামের এই অভাবনীয় সাফল্যের গল্পটি একেবারে ছোট পরিসরে শুরু হয়েছিল ২০১৬ সালে। তখন তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল পরিবারের দুধের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানো। বাবার অনুপ্রেরণায় প্রথমে একটি গাভি কিনে নিজ বাড়ির আঙিনায় লালন-পালন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে আরও ৪টি গরু কিনে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু হয় সাদ্দামের। বাবার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে খামারটির নামকরণ করেন বাবার নামে ‘হাবিব ডেইরি এন্ড এগ্রো।’

শুরুর সেই ছোট পরিসরের খামারটি আজ সাদ্দামের দিনরাত পরিশ্রম ও অদম্য চেষ্টায় এক বিশাল ডেইরি ও এগ্রো প্রজেক্টে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে তার ফার্মে রয়েছে ছোট বড় ৮৫টি গরু, ৬টি মহিষ, ৮২টি ছাগল, ১০টি ভেড়া ও ৪টি ঘোড়া। মাত্র ১৩-১৪ লাখ টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ থেকে শুরু হওয়া এই খামারের বর্তমান বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় আড়াই কোটি টাকায়।

সাদ্দাম হোসেন কেবল নিজের ভাগ্যই পরিবর্তন করেননি, বরং এলাকার সামষ্টিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে রেখেছেন এক বিরাট অবদান। বর্তমানে তার খামারে সরাসরি কর্মরত রয়েছেন ৭ জন শ্রমিক। যাদের পুরো পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এই ফার্মের মাধ্যমে। এখানেই শেষ নয়, খামারের উৎপাদিত প্রতিদিন ৫০০ লিটারেরও বেশি দুধ সংগ্রহ ও স্থানীয় বাজারে ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত রয়েছেন আরও অন্তত ১৫ জন দুধ ব্যবসায়ী। পাশাপাশি এলাকাবাসী প্রতিদিন পাচ্ছেন পুষ্টিকর ও ভেজালমুক্ত খাঁটি দুধ, যা জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

তরুণ এ উদ্যোক্তার সফলতার মূল ভিত্তি হলো তার সততা ও মানবিকতা। কর্মচারীদের কেবল শ্রমিক হিসেবে না দেখে, তাদের নিজের পরিবারের সদস্যের মতো মনে করেন তিনি। 

সাদ্দামের সঙ্গে আলাপকালে জানান, খামারের কাজের লোকদের জন্য দুধ পানের কোনো নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা নেই, বরং তাদের যেকোনো পারিবারিক বা অর্থনৈতিক সংকটে সবসময় পাশে দাঁড়ায় ‘হাবিব ডেইরি এন্ড এগ্রো।’

সাদ্দাম তার এই মানবিক গুণাবলী ও সফলতার পুরো কৃতিত্ব দিতে চান তার প্রয়াত পিতাকে। বাবার কাছ থেকেই তিনি শিখেছেন কীভাবে মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতে হয়।

মূলত দুগ্ধ উৎপাদন ও প্রজননকেন্দ্রিক তার এই খামারে বেশিরভাগ ফ্রিজিয়ান জাতের গাভী পালন করা হচ্ছে। নতুন করে গত তিন বছর আগে শুরু করেছেন ছাগল পালন। মাত্র ৪টি ছাগল নিয়ে শুরু করেছিলেন। বর্তমানে ব্ল্যাক বেঙ্গল ও যমুনাপারি বা তোতাপুরি জাতের ছোট বড় ৮২টি ছাগল রয়েছে এ খামারে।

সাদ্দাম হোসেন জানান, খামারের প্রয়োজনে ও কোরবানির সময়ে গরু ক্রয় বিক্রয় করা হলেও এখন পর্যন্ত ছাগল বিক্রয় করা হয়নি। শুরুর ৪টি ছাগল থেকেই ৮২টি হয়েছে। তবে পরিবারের প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে খাসির মাংস খাওয়া হয়।

ঘোড়া পালনের কারণ হিসেবে সাদ্দাম হোসেন বাসস’কে বলেন, দূর-দুরান্ত থেকে ঘাস আনতে যানবাহন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে তিনি ৪টি ঘোড়া পালন করেন। বর্তমানে ঘোড়ার গাড়িতে করে পশুখাদ্য আনার ফলে পরিবহন খরচ আগের চেয়ে কমেছে।

খামার পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিলো কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সাদ্দাম হোসেন বাসস’কে বলেন, ‘তেমন কোন অভিজ্ঞতা বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিলোনা, তবে ইউটিউব দেখে বিভিন্ন অভিজ্ঞ লোকদের পরামর্শ শুনেছি। কোন জাতের গরু কোথায় পাওয়া যায়, কিভাবে পালন করলে ভালো হবে তা জানার চেষ্টা করি সবসময়। এভাবেই ধীরে ধীরে নিজেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। এছাড়া গাজীপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। খামারে রোগব্যাধিজনিত কোন জটিলতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিসম্পদ অফিসের লোকজনের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই।’

নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে সাদ্দাম হোসেনের পরামর্শ হলো, ‘ফেসবুকে বা ইউটিউভ ভিডিওতে যেমনটা দেখানো হয় যে, খামার করলেই রাতারাতি লাখ লাখ টাকা লাভ, বাস্তব চিত্র তেমনটা নয়। ব্যবসার প্রতিটি ধাপ ভালোভাবে বুঝে, ধৈর্য ধরে, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা নিয়ে নামলে তবেই সম্পদ ও সফলতা টেকসই হয়।’
সাদ্দাম হোসেনের প্রতিবেশী মিজানুর রহমান বলেন, সাদ্দাম হোসেনকে দেখে তিনিও ৪টি গাভী নিয়ে ছোট আকারে একটি ফার্ম করেছেন। বর্তমানে ৩টি গাভী থেকে যে দুধ আসে তা বিক্রি করে ছেলেমেয়ের লেখাপড়াসহ সংসারের খরচ চালাতে আর সমস্যা হচ্ছেনা। 

সাদ্দাম হোসেনের চাচা সম্পর্কের প্রতিবেশী নূরুল ইসলাম বলেন, ‘সাদ্দাম এ গ্রামের গর্ব। সে অনেক কষ্ট করে খামার করেছে। তার খামারের দুধ বিক্রি করে অনেকের জীবিকা চলছে। এছাড়া গরীব দুঃখী মানুষের জন্যও সাদ্দাম যথেষ্ট সহযোগিতার চেষ্টা করেন।’

চাকরিপ্রার্থী না হয়ে চাকরিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া সাদ্দাম হোসেন আজ দেশের তরুণ প্রজন্মের সামনে এক অনুকরণীয় আদর্শ। সততা, সঠিক পরিকল্পনা এবং অদম্য চেষ্টা থাকলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে কীভাবে পুনরুজ্জীবিত করা যায়, ‘হাবিব ডেইরি এন্ড এগ্রো’ তার এক জীবন্ত দলিল।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নারগিস খানম বাসস’কে বলেন, সাদ্দাম হোসেনের মতো যেকোন খামার মালিক তাদের খামারের পশু পালন সংক্রান্ত যেকোন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রাণিসম্পদ অফিস খামার মালিকদের সহযোগিতায় সবসময় পাশে থাকবে। 

তিনি বলেন, গাজীপুর জেলায় নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলে ১ হাজার ৮৮৬টি ডেইরি খামার রয়েছে।

সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ শাহীন মিয়া বাসস’কে বলেন, হায়দরাবাদ গ্রামের ‘হাবিব ডেইরি এন্ড এগ্রো’র মালিক সাদ্দাম হোসেন একজন সফল খামারি। এটি একটি নিবন্ধিত ডেইরি খামার। আমরা তার খামারটি কয়েকবার ভিজিট করেছি এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়েছি। 

তিনি বলেন, তার খামােের হলিস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভী আছে যেটি প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লিটার দুধ দেয়।