শিরোনাম

॥ মনসুর আহম্মেদ ॥
রাঙামাটি, ১৬ জুন ২০২৬ (বাসস) : রাঙামাটির দুর্গম পাহাড়ের পরিত্যক্ত প্রায় ৩০ একর পাহাড়ি ঢালু জমিতে দেশি-বিদেশি প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম চাষ করে বিশ^ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন তরুণ উদ্যোক্তা চিকু চাকমা ও পলাশ চাকমা। আম চাষ করে সফল হওয়া পাহাড়ের এই দুই তরুণ উদ্যোক্তার স্বপ্ন পাহাড়ের উৎপাদিত আম বিশ্ব বাজারে নিয়ে যাওয়া।
এগুলো সাধারণ কোনো আম নয়। এই বাগানের বিশেষ আকর্ষণ রঙিন আম। বিশ্বখ্যাত জাপানি ‘মিয়াজাকি’ বা ‘সূর্যডিম’। এ ছাড়া রয়েছে ব্ল্যাক স্টোন, কিউজাই, রেড আইভরি, কিং অব চাকাপাত, সিমুয়াং, বারি ১৩, অস্টিন, পুজাচুরিয়া, পুজা অরুনিমা, অম্বিকা,আরটুইটু, গোলাপ খাস, ত্রি টেস্ট, রেড পালমার, কেনসিনটন প্রাইড, ভ্যালেসিয়া প্রাইড, নেম ডকমাই। এ ছাড়াও রয়েছে ব্রুনাই কিং, বারি ৪, কাঁচা মিঠা বারোমাসিসহ ৩৫ প্রজাতির আম। বিষমুক্ত ও নিরাপদ পদ্ধতিতে উৎপাদিত এই আম এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানির স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
উদ্যোক্তারা বাসসকে জানান, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে এই বাগানের আমের গুণগত মান আন্তর্জাতিক স্তরের। সরকারের পক্ষ থেকে একটু সহযোগিতা পেলে খুব দ্রুতই বিদেশে এই আম রপ্তানি শুরু করা সম্ভব। এজন্য তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছেন।
চার বছর আগে কঠিন পরিশ্রমে গড়ে তোলা বাগানে পাহাড়ের বুক চিরে এখন দৃশ্যমান বিভিন্ন দেশি-বিদেশি প্রজাতির ৩৫টিরও বেশি জাতের আমের এক ভিন্ন রঙের মেলা।
রাঙামাটি সদর উপজেলার কাপ্তাই লেক বেষ্টিত বালুখালি ইউনিয়নের দুর্গম মরিশ্যাবিল এলাকায় গড়ে উঠেছে এমনই এক বিশাল ফলের স্বর্গরাজ্য। পর্যটন শহর রাঙামাটির সবুজ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চোখ জুড়ানো লাল, বেগুনি আর সোনালি রঙের আম জানান দিচ্ছে এক নতুন এক সম্ভাবনার কথা। দুই তরুণ উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রম, মেধা আর আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখানে চাষ হচ্ছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির আম।
উদ্যোক্তা চিকু চাকমা বাসসকে বলেন,‘পাহাড়ে কঠোর পরিশ্রম ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে এত উন্নত মানের আম উৎপাদন সম্ভব, তা আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি। এ বছর বাগান থেকে আমাদের ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কঠোর পরিশ্রমের পর এই সাফল্য দেখে সব কষ্ট ভুলে গেছি।’
উদ্যোক্তা পলাশ চাকমা বলেন, চার বছর আগে আমরা দুই বন্ধু মিলে কঠোর পরিশ্রম করে রাঙামাটির বালুখালীতে পরিত্যক্ত জমিতে আম বাগান করে অনেকটাই সফল হয়েছি। এই আম জেলাসহ দেশের বিক্রি হচ্ছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য হলো এই আমকে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়া। রাঙামাটির আম ব্র্যান্ডিং করা। এজন্য যা যা করণীয় সে বিষয়ে আমরা কৃষি বিভাগের পরামর্শ গ্রহণ করছি। আশা করছি আমাদের স্বপ্ন সফল হবে।
পাহাড়ের সফল এই ব্যতিক্রমী ও বিশাল বাগানটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে রাঙামাটির বিশিষ্ট কৃষিবিদ পবন কুমার চাকমা বাসসকে বলেন, আমি পুরো বাগানটি ঘুরে দেখেছি। বলতে গেলে দুই তরুণ উদ্যোক্তার কঠোর পরিশ্রমে রাঙামাটির পরিত্যক্ত পাহাড়ে অসাধারণ একটি বাগান গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, এই বাগানের আমের কোয়ালিটি অত্যন্ত চমৎকার এবং আন্তর্জাতিক মানের। আমগুলো শতভাগ বিদেশি বাজারে রপ্তানিযোগ্য। এখন শুধু প্রয়োজন সঠিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং নিশ্চিত করা। সেটি করা গেলে এই আম অনায়াসেই বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে এবং পাহাড়ে কৃষি সম্ভাবনার বিষয়টি সবখানে ছড়িয়ে যাবে। এজন্য তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করেন।
তরুণদের এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে শুরু থেকেই পাশে রয়েছে রাঙামাটি সদর উপজেলা কৃষি বিভাগ। আধুনিক প্রযুক্তির সুফল চাষিদের হাতে-কলমে পৌঁছে দিতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে বলে বাসসকে জানিয়েছেন, রাঙামাটি সদরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা দেবাশীষ দেওয়ান।
দেবাশীষ দেওয়ান বাসসকে বলেন, এই দুই তরুণ উদ্যোক্তা পাহাড়ের কৃষিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শুধু বালুখালীর মরিশ্যাবিল এলাকা নয়, রাঙামাটির প্রত্যন্ত দুর্গম পাহাড়ের অব্যবহৃত পরিত্যক্ত জমিতে বছর বছর বাড়ছে আমসহ অন্যান্য ফলফলাদির বাগান। এসব বাগান করে সফল হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বর্তমানেও আম বাগানের প্রতিটি গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলছে রঙ-বেরঙের দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির আম।
পাহাড়ের তরুণ উদ্যোক্তা চিকু চাকমা(৪২) ও পলাশ চাকমা ছাড়াও এখানকার সফল উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য কেবল স্থানীয় বাজার ধরা নয়, বরং বিশ্ব দরবারে পাহাড়ের এই প্রিমিয়াম কোয়ালিটির আমসহ অন্যান্য উৎপাদিত ফল পৌঁছে দেওয়া।
বিদেশের বাজারে রপ্তানির উপযোগী করতে বাগানে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ প্রযুক্তি। এই বিশেষায়িত ব্যাগ ব্যবহারের ফলে আমগুলো ক্ষতিকারক পোকা-মাকড় ও বৈরী আবহাওয়া থেকে রক্ষা পাচ্ছে। একই সাথে আমের গায়ে কোনো দাগ পড়ছে না, যা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য অত্যন্ত জরুরি আকর্ষণীয় রং ও গুণগত মান নিশ্চিত করছে। পাহাড়ের এসব সফল উদ্যোক্তাদের সরকারী সহায়তা প্রদান করা গেলে পাহাড় হয়ে উঠতে পারে দেশের কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি সফল উর্বর ভূমি।