শিরোনাম

॥ মোতাহার হোসেন ॥
ঢাকা, ১৬ জুন, ২০২৬ (বাসস) : খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার ভদ্রা নদীতে নৌকায় কাজ করছিলেন মোস্তফা মোল্ল্যা ও তার সঙ্গীরা। এ সময় হানা দেয় জলদস্যুরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পাঁচজনকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় সুন্দরবনের গহীন জঙ্গলে। পরে মুক্তিপণের দাবিতে তাদের জিম্মি করে রাখা হয় দিনের পর দিন। পরিবারের সদস্যরা যখন প্রিয়জনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখন কোস্ট গার্ডের অভিযানে উদ্ধার হন তারা।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মোস্তফা মোল্ল্যা বাসস’কে বলেন, ‘আমরা পাঁচটি নৌকা নিয়ে ভদ্রা নদীতে কাজ করতে যাই। এ সময় প্রতিটি নৌকা থেকে একজন করে তুলে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। এরপর মুক্তিপণের জন্য আমাদের মারধর করা হয়। পরে কোস্ট গার্ড আমাদের জীবন বাঁচিয়েছে।’
শুধু এই জেলেরাই নন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় দস্যু, অস্ত্র ও মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানে একের পর এক সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। কুখ্যাত কয়েকটি দস্যুবাহিনীর সদস্যদের আটক, আস্তানা ধ্বংস, জিম্মি উদ্ধার এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জব্দের মাধ্যমে উপকূল ও সুন্দরবনে অপরাধী নেটওয়ার্কের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে বাহিনীটি। এসব অভিযানে দস্যুদের কবল থেকে জীবিত উদ্ধার হয়েছেন জেলে ও পর্যটকসহ অনেক নিরীহ মানুষ।
কোস্ট গার্ড জানায়, করিম-শরীফ, নানাভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীর মতো কুখ্যাত দস্যুচক্রের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি এবং ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মতো বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাদের সাঁড়াশি অভিযানের ফলে অধিকাংশ দস্যুবাহিনী প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে দস্যুদের সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্যে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযান চলছে।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের মে পর্যন্ত গত তিন মাসে পরিচালিত অভিযানে সুন্দরবনে ৩৯ জন বনদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগান গোলা, ১টি ককটেল, ১টি টেলিস্কোপ ও ২টি ওয়াকি-টকি উদ্ধার করা হয়।
এছাড়াও বনদস্যুদের কাছে জিম্মি থাকা মোট ৪১ জন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযানে করিম-শরীফ বাহিনীর ৫টি, ছোট সুমন বাহিনীর ৪টি এবং ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১টি আস্তানা ধ্বংস করা হয়।
এছাড়া গত বছর (২০২৫ সালে) সুন্দরবনে পরিচালিত অভিযানগুলোতে বিভিন্ন দস্যুবাহিনীর মোট ৫০ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৪৭টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৫৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ২৯৮ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ২টি হাতবোমা এবং ২টি ককটেলসহ বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। একই সময়ে দস্যুদের কবল থেকে ৬৭ জন জেলে, দুইজন পর্যটক এবং একজন রিসোর্ট মালিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড সূত্র জানিয়েছে, মানবপাচার ও মাদক প্রতিরোধেও কোস্ট গার্ড তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। দেশের উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপথে মানবপাচার রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক টহল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে।
গত এক বছরে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে ১৯১ জন বাংলাদেশি ও ৪২৭ জন রোহিঙ্গাসহ মানবপাচারের শিকার মোট ৬১৮ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ৫১ জনকে আটক করা হয়েছে। পাশাপাশি মাদক পাচার রোধে নিয়মিত টহলও জোরদার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দা আমিনুর সানা বলেন, ‘আমরা সুন্দরবন এলাকায় বসবাস করি। এই অঞ্চলে জীবনযাপন সবসময়ই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতিকারীরা আমাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, নানা ধরনের হয়রানি ও সমস্যার সৃষ্টি করে। এতে করে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায়ই ব্যাহত হয়। তবে কোস্ট গার্ড নিয়মিত টহল ও কঠোর অবস্থানের কারণে এখন স্বস্তি ফিরেছে। তারা না থাকলে এই এলাকায় বসবাস এবং নিরাপদে চলাচল করা আমাদের জন্য অনেক বেশি কঠিন হয়ে যেত।’
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বাসস’কে বলেন, দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুন্দরবনে সম্পূর্ণরূপে বনদস্যু নির্মূল এবং সমুদ্র ও নদীতীরবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।
ভবিষ্যতেও জননিরাপত্তা নিশ্চিত ও অপরাধ দমনে কোস্ট গার্ডের অভিযান এবং টহল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বাসস’কে বলেন, বর্তমান সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে অপরাধচক্রগুলোও সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে তারা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। শুধু একটি বাহিনীর একক প্রচেষ্টায় এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সেখানে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থাসহ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তার মতে, শুধু দমন বা গ্রেফতার দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। যাদের এসব অপরাধে সম্পৃক্ততা আছে, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।