শিরোনাম

॥ রেজাউল করিম মানিক ॥
রংপুর, ৮ জুন, ২০২৬ (বাসস) : রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাজীপুর গ্রামের গোলজার হোসেন (৫০) এক সময় অভাবের তাড়নায় দিন মজুরের কাজ করতেন। এখন তিনি এলাকায় পরিচিত ধানক্ষেতে মাছ চাষের সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি। তাঁর দেখানো পথে সচ্ছলতা এসেছে গ্রামের আরও অনেক পরিবারে। স্থানীয়রা গুলজারকে এখন ধানক্ষেতে মাছ চাষের ‘গুরু’ বলেই চেনেন।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের ইকরচালী ইউনিয়নের হাজীপুর গ্রামে এখন ধানক্ষেতেই মাছ চাষের দৃশ্য চোখে পড়ে। সবুজ ধানের মাঝখানে জমে থাকা পানিতে বিভিন্ন জাতের মাছ করেন কৃষকরা। ধান ও মাছের এই সমন্বিত চাষ এখন গ্রামের পরিচিত কৃষি পদ্ধতি।
গোলজার হোসেন বাসস’কে জানান, ৬ ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেজ। বাবার অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। ১৯৯৮ সালে বিয়ে করেন পাশের হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কুঠিয়ালপাড়া গ্রামের তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে নীলুফা বেগমকে। বিয়ের পর পরিবার তাঁকে আলাদা করে দিলে সংসারে দেখা দেয় অভাব।
২০০৫ সালে কুঠিয়ালপাড়া গ্রামের এনামুল হক তাকে ধানক্ষেতে মাছ চাষের পরামর্শ দেন। এক একর জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধানের খেতে মাছের চাষ করেন তিনি। প্রথম বছরেই ধান ও মাছ বিক্রি করে খরচ বাদে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ হয়। এরপর পুরোপুরি ধানক্ষেতে মাছ চাষ ও জমির আইলে লিচু চাষে লেগে পড়েন তিনি।
প্রথম বছরের লাভের টাকা দিয়ে পরের বছরে দুই একর জমি বর্গা নেন। সেবার ধান ও ক্ষেতের মাছ বিক্রি করে আয় করেন তিন লাখ টাকা। এভাবে এক পর্যায়ে চাষের জমি বাড়ে, আয় বাড়ে।
দিন মজুর থেকে গোলজার হয়ে ওঠেন সফল চাষি। কিনেন তিন একর জমি, তৈরি করেন পাকা বাড়ি। এখন তাঁর ৪ সন্তান লেখাপড়া করছে।
এবার পাঁচ একর জমিতে ধানক্ষেতে মাছ চাষ করেছেন তিনি। এরমধ্যে দুই একর জমি থেকে ইতোমধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার ধান ও মাছ বিক্রি করেছেন। বাকি জমি থেকে আরও ৫ লাখ টাকার বেশি আয় হবে বলে আশা করছেন।
গোলজারের সফলতায় অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অনেকেই ধানক্ষেতে মাছ চাষ শুরু করেছেন। এক সময় দিনমজুর হিসেবে পরিচিত মফিজার রহমান এখন নিজের জমিতে ধান ও মাছ চাষ করছেন। আবুজার হোসেনও এই পদ্ধতিতে সফল হয়ে পুকুর, হাঁসের খামার ও গবাদিপশুর খামার গড়ে তুলেছেন।
গ্রামের শিক্ষিত যুবক মজিদুল হক বাসস’কে বলেন, ‘ধানক্ষেতে মাছ আর হাঁসের সমন্বিত চাষ করছি। মাছের খরচেই ধান চাষ হয়ে যায়। এতে লাভও বেশি।’
গোলজার হোসেনের মতে, যে জমিতে অন্তত তিন ইঞ্চি পানি ধরে রাখা যায়, সেখানে মাছ চাষ সম্ভব। জমির চারপাশের আইল উঁচু করতে হয় এবং ধান রোপণের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে মাছের পোনা ছাড়তে হয়। শিং, মাগুর, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা ও সিলভার কার্প চাষে ভালো লাভ পাওয়া যায়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ধীবা রানী রায় বাসস’কে বলেন, ‘ধানক্ষেতে মাছ চাষে ধানের ফলন বাড়ে এবং কীটনাশকের ব্যবহার কমে। এতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে।’
উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বাসস’কে বলেন, গোলজার হোসেন এই এলাকার মডেল কৃষক। তাঁর দেখানো পথে এখন অনেকেই ধানক্ষেতে মাছ চাষ করছেন। এতে স্থানীয়ভাবে মাছের উৎপাদনও বাড়ছে।