শিরোনাম

\ দেলোয়ার হোসাইন আকাইদ \
কুমিল্লা, ৪ জুন, ২০২৬ (বাসস) : কুমিল্লার সীমান্তের মাটিতে একজন কৃষকের চাষ করা লাল ও কালো রঙের আকর্ষণীয় আঙুর দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি স্বাদেও বেশ মিষ্টি। স্থানীয়রা অনেকেই এখন এই সুমিষ্ট আঙুর চাষের স্বপ্ন দেখছেন।
বাংলাদেশে আঙুর চাষের কথা উঠলেই অনেকের মনে ভেসে ওঠে বিদেশের বিস্তীর্ণ আঙুর বাগানের ছবি।
দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল যে দেশের আবহাওয়া ও মাটি আঙুর চাষের জন্য খুব একটা উপযোগী নয়।
ফলে বাজারে পাওয়া আঙুরের প্রায় পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়।
দীর্ঘদিনের সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কুমিল্লার সীমান্তবর্তী কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল এখন আঙুর চাষে সাফল্যের নতুন গল্প লিখছেন।
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা শরিফপুর গ্রামের কৃষক সেকুল দীর্ঘদিন ধরেই ব্যতিক্রমধর্মী কৃষিকাজে আগ্রহী।
সেকুলের বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল ও কালো রঙের সুস্বাদু আঙুর। এই সাফল্য শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই তার আঙুর চাষের যাত্রা শুরু।
আঙুর উৎপাদনের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে আক্তারুজ্জামান সেকুল ভারতে প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ গ্রামের ৮২ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আঙুরের বাগান গড়ে তোলেন।
বাগানে তিনি তিনটি উন্নত জাতের আঙুরের চারা রোপণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাইনুকুর, রাশিয়ান ভ্যারাইটি ও তুরস্কের জনপ্রিয় সিডলেস ভ্যারাইটি।
শুরুতে অনেকেই সেকুলের এই উদ্যোগকে কৌতূহলের চোখে দেখলেও সেকুল আত্মবিশ্বাস হারাননি। বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক ছাঁটাই, সেচ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছগুলোকে বড় করে তোলেন তিনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, চারা রোপণের মাত্র ১০ মাসের মধ্যেই গাছে ফল ধরতে শুরু করে। শত শত থোকা আঙুরে ভরে যায় পুরো বাগান।
তবে সেকুল প্রথম বছরেই বেশি ফলনের দিকে না গিয়ে, গাছের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও উৎপাদন সক্ষমতার কথা বিবেচনা করেন। এ জন্য তিনি অনেক কুঁড়ি ও ফলের থোকা ছেঁটে ফেলেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি থোকা রেখে দেন। এগুলোই এখন পরিপক্ব হয়ে গাছে ঝুলছে।
প্রতিটি থোকার ওজন প্রায় আধা কেজি। সে হিসেবে বর্তমানে প্রায় ১০০ কেজির মতো আঙুর গাছে রয়েছে।
লাল ও কালো রঙের আকর্ষণীয় আঙুরগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি স্বাদেও বেশ মিষ্টি। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ফল হলেও এর গুণগত মান বিদেশি আঙুরের সঙ্গে তুলনীয় বলে মনে করছেন অনেকে।
কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল বলেন, অনেকেই বলেছিলেন বাংলাদেশে ভালো আঙুর হবে না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, সঠিক প্রযুক্তি ও পরিচর্যা জানলে অবশ্যই সফল হওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, প্রথম ফলনেই যে সাড়া পেয়েছি, তাতে আমি আশাবাদী। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আঙুর উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সেকুল আরও বলেন, আমি চাই এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রচলিত ফসলের পাশাপাশি আঙুর চাষেও এগিয়ে আসুক। বাজারে আঙুরের চাহিদা অনেক বেশি।
পরিশ্রমী এই কৃষক বলেন, সঠিক পরিকল্পনায় চাষ করতে, পারলে এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ফসল হতে পারে।
আঙুর বাগানটির কথা ছড়িয়ে পড়ার পর আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিনই মানুষ বাগান দেখতে আসছেন। কেউ কৌতূহলবশত, কেউ আবার নতুন সম্ভাবনা খুঁজতে।
ছোট-বড় সবার কাছেই বাগানটি এখন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কুমিল্লার উদ্যোক্তা ও লালমাই লেক ল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মফিজুল ইসলাম বাগানটি পরিদর্শন করে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, আমি বাগানটি দেখে সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছি। আমাদের দেশে আঙুর চাষ এভাবে সফল হতে পারে, তা আগে কল্পনাও করিনি।
মফিজুল ইসলাম বলেন, লালমাই পাহাড় এলাকায় আমার কিছু জমি রয়েছে। সেখানে আমিও আঙুরের বাগান করার পরিকল্পনা করছি। এ বিষয়ে আক্তারুজ্জামান সেকুল ভাইয়ের পরামর্শ ও সহযোগিতা চেয়েছি। তিনি সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, যদি বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করা যায়, তাহলে এটি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করবে এবং একই সঙ্গে বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও কিছুটা কমবে।
আঙুর বাগানটির দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ। অনেকেই জীবনে প্রথমবারের মতো গাছ থেকে সরাসরি আঙুর পেড়ে খাওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
দর্শনার্থী মুনজেরিন চৌধুরী বলেন, আমাদের এলাকায় আঙুরের বাগান আছে শুনে দেখতে এসেছি। আগে শুধু বাজার থেকে আঙুর কিনে খেয়েছি। কিন্তু গাছ থেকে পেড়ে তাজা আঙুর খাওয়ার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। এই আঙুরগুলোর স্বাদও অসাধারণ।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়লে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষ করে, তরুণ কৃষকদের জন্য এটি একটি উৎসাহব্যঞ্জক উদাহরণ।
আরেক দর্শনার্থী মাসুদা ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের আঙুর নিয়ে তার ধারণা ছিল ভিন্ন।
তিনি বলেন, আমি সব সময় শুনেছি দেশে আঙুর চাষ করলে ফল টক হয়। কিন্তু এখানে এসে আমার সেই ধারণা বদলে গেছে। এই বাগানের আঙুরগুলো বেশ মিষ্টি, রসালো ও সুগন্ধযুক্ত। স্বাদে ও গুণে এগুলো অনেক উন্নত।
স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও বাগানটি নিয়ে আলোচনা চলছে। অনেকে ইতোমধ্যেই আঙুর চাষ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছেন। কেউ কেউ পরীক্ষামূলকভাবে নিজ জমিতে আঙুরের চারা লাগানোর কথাও ভাবছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান রহমান বলেন, আমরা শুরু থেকেই কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুলের আঙুর বাগান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছি। এখন পর্যন্ত বাগানটির ফলনের অবস্থা থেকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
তিনি আরও বলেন, কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকার মাটি ও জলবায়ু আঙুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে উঁচু জমি ও টিলাভূমিতে এ ফসলের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ আঙুর চাষে আগ্রহী হলে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে রয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, ছোট-বড় টিলা এবং তুলনামূলকভাবে উঁচু ভূমি। এ সব এলাকার মাটির গঠন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ফল চাষের জন্য উপযোগী।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে এ সব এলাকায় আঙুর চাষ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে।