শিরোনাম

/ আজাদ রুহুল আমিন /
বাগেরহাট, ১ জুন, ২০২৬, (বাসস): বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণী ও মৎস্যসম্পদের প্রজনন সুরক্ষায় আজ ১ জুন থেকে টানা তিন মাসের জন্য বনটিতে সব ধরনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বন বিভাগ।
আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। পূর্ব সুন্দরবন বাগেরহাট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ডিএফ ও মো, রেজাউল করিম চৌধুরী বাসসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সময় জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারীসহ কোনো বনজীবী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারবেন না। তবে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর এবার ব্যতিক্রম হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র।
প্রজনন মৌসুমে কঠোর সুরক্ষা
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রধান প্রজননকাল। এ সময়ে বনাঞ্চলের নদী-খালগুলো বিভিন্ন প্রজাতির মাছের ডিম ছাড়ার নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে।
একই সঙ্গে বনাঞ্চলের উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম ও নতুন চারা জন্মানোর জন্যও সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, প্রজনন মৌসুমে মানুষের উপস্থিতি, নৌযান চলাচল, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটন কার্যক্রম বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও প্রজনন প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে। তাই এ সময়ে সুন্দরবনকে সম্পূর্ণ নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশে রাখা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য অপরিহার্য।
তিনি জানান, ২০২০ সাল থেকে প্রজনন মৌসুমে সুন্দরবনকে মানুষের সব ধরনের হস্তক্ষেপমুক্ত রাখার নীতি অনুসরণ করছে বন বিভাগ।
করমজল উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বাসসকে বলেন, ২০২০ সালের পর এই প্রথমবারের মতো করমজল কেন্দ্র পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হচ্ছে। পশুর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার কার্যক্রমে বনাঞ্চল, মৎস্যসম্পদ কিংবা বন্যপ্রাণীর ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে আমরা মনে করছি।
যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার
বন বিভাগ জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কোনো ধরনের পাস বা পারমিট ইস্যু করা হবে না। কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে বন আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বনজীবীদের উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগটি ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হলেও সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। আয়-রোজগারের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আগামী তিন মাস সংসার চালানো নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন বনজীবীরা।
বনজীবীদের অভিযোগ, বিকল্প কর্মসংস্থান বা পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা ছাড়া দীর্ঘ তিন মাস বন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত তাদের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। অনেককে ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয় এবং মহাজনদের কাছে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়তে হয়।
তারা নিষেধাজ্ঞার সময়ে খাদ্য সহায়তা ও বিশেষ প্রণোদনার দাবি জানিয়েছেন।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল কয়েকজন বনজীবী অভিযোগ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে। তাদের দাবি, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী চক্রের সহায়তায় একশ্রেণির অসাধু জেলে অভয়ারণ্যের নদী-খালে বিষ প্রয়োগসহ বিভিন্ন অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার করে থাকে।
তারা আরও অভিযোগ করেন, বনসংলগ্ন ও বনাঞ্চলের ভেতরের নদী-খালে অবৈধ নেটজালের মাধ্যমে মাছের পোনা নিধন অব্যাহত থাকলেও তা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়।
বিকল্প কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক শুভ্র শচীন বাসসকে বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বননির্ভর মানুষের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তিনি বলেন, মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হওয়ায় কিছু মানুষ জীবিকার তাগিদে অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। সরকারি সহযোগিতা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে বননির্ভরতা ও অপরাধপ্রবণতা—দুটিই কমবে।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে বনজীবীদের জন্য খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সুন্দরবনের অর্থনীতি ও নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী
বন বিভাগের তথ্যমতে, বাংলাদেশের অংশে সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় ৩১ শতাংশ জলভাগ। এখানে রয়েছে ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি এবং ১৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী।
সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। প্রতি বছর ১২ হাজারের বেশি জেলেনৌকা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যায়। এছাড়া বছরে দুই লাখেরও বেশি দেশি-বিদেশি পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে ৫ হাজার ৮০০ এবং পশ্চিম বিভাগে ৬ হাজার ৩১০ জন নিবন্ধিত বনজীবী রয়েছেন।