শিরোনাম

ফারাজী আহম্মদ রফিক বাবন
নাটোর, ১৫ মে, ২০২৬, (বাসস): নাটোরে বাণিজ্যিকভাবে আখ ও ভুট্টার আবাদ বাড়তে শুরু করেছে। উৎপাদন খরচ কম এবং বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় জেলার কৃষকরা এখন এই দুটি ফসল চাষে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
অথচ রকমারি ফল উৎপাদনের উর্বর ভূমি নাটোর। বিগত দুই দশক আগে জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম উৎপাদন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আমের আবাদ এবং ফলন ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও বর্তমানে কমতে শুরু করেছে।
অপরদিকে, জেলার লালপুর, বাগাতিপাড়া ও বড়াইগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে আখ ও ভুট্টার চাষ হয়েছে।
এবার নাটোরে ১৪ হাজার ৭৩৭ হেক্টর জমিতে আখের আবাদ হচ্ছে। এছাড়া নাটোর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ১০ হাজার একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে।
অপরদিকে, প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষ হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, আখ ও ভুট্টায় রোগবালাই কম এবং সেচ খরচও সীমিত। নাটোর ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের পক্ষ থেকে চাষিদের উন্নত বীজ ও ঋণ সুবিধা দেওয়ায় আখের আবাদ আবারও চাঙ্গা হয়েছে।
২০২০ সালে জেলায় আমের আবাদি জমি ছিল পাঁচ হাজার ৭২৪ হেক্টর। ওই সময় ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ২৪০টি আম গাছ থেকে মোট ৭৯ হাজার ৭৬৭ টন আম উৎপাদন হয়েছিল। আর হেক্টর প্রতি আমের গড় ফলন ছিল ১৩.৯ টন।
পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে আমের জমির পরিধি কমে হয়েছে পাঁচ হাজার ৬৯৩ হেক্টর। গাছের সংখ্যাও কমেছে।
বর্তমানে গাছের সংখ্যা ১৪ লাখ ৮০ হাজার ৭০০টি। চলতি বছর মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬ হাজার ৪৫১ টন। প্রত্যাশিত গড় ফলন ১১.৭ টন।
দেশের প্রসিদ্ধ ফল উৎপাদক সেলিম রেজা বলেন, এখন জমির ইজারা মূল্য অনেক বেশি। আম চাষ করে কৃষকের স্বস্তি নেই। কারণ প্রতিকূল আবহাওয়া, পোকামাকড়ের উপদ্রব অনেক বেশি।
পক্ষান্তরে অন্য শস্য যেমন পাট আবাদ করে লোকসান হলেও পাটকাঠি বিক্রি করে, ধানের দর কম হলেও খড় বিক্রি করে কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে যায়। আবার ভুট্টাসহ কিছু শস্য অনেক লাভজনক। তাই কৃষকরা আম চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
বড়াইগ্রাম উপজেলার জোয়ারি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মোস্তফা কামালের ৩০ বিঘা জমিতে আমের বাগান ছিল। এখন আর নেই। ওই জমিতে এখন আখ আর ভুট্টা চাষ হয়।
আমের চেয়ে আখ লাভজনক, বিরূপ আবহাওয়া হলেও আখের ফলনের কোনো তারতম্য হয় না। আর ভুট্টা আরও লাভজনক। ভুট্টার জমি অন্য শস্য আবাদেও ব্যবহার করতে পারি-বললেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল।
জেলার প্রসিদ্ধ আহমেদপুর আম আড়তের ব্যবসায়ী আহমেদুল কবীর বলেন, বিগত সময়ে আমের বাজার নিম্নমুখী হয়েছে।
পাঁচ বছর আগে আঁটির আম মণ প্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা, কালুয়া-খিরসা-ল্যাংড়া মণ প্রতি তিন হাজার টাকা এবং আম্রপালি সাড়ে তিন হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হলেও গত বছর আঁটির আম মণ প্রতি সাতশ’ থেকে আটশ’ টাকা, কালুয়া-খিরসা-ল্যাংড়া দেড় হাজার টাকা এবং আম্রপালি দুই হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়েছে।
আহমেদুল কবীর আরও বলেন, শুধু নিম্নমুখী দরই নয়, নিরবচ্ছিন্ন পরিচর্যার অভাব এবং বিকল্প আবাদে মুনাফা বেশি হওয়ার প্রেক্ষাপটে আম উৎপাদকরা আম চাষের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।
আম ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, অনেক সময় ব্যবসায়ীরা আম বাগান ইজারা নিয়ে অধিক ফলের জন্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক স্প্রে করেন, পরে ওই গাছে ফলন বিপর্যয় ঘটে। পরিণতিতে বাগান মালিক গাছ কাটতে বাধ্য হন।
লালপুর উপজেলা কৃষি অফিসার প্রীতম কুমার হোড় জানান, উপজেলায় লক্ষ্মণভোগ আমের বাগান আছে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে। এই আমের চাহিদা এবং বাজার দর নিম্নমুখী। তাই আম উৎপাদকরা এই গাছ কেটেছেন ব্যাপকভাবে। ওই বাগানে তারা উচ্চমূল্য আম যেমন কাটিমন, বারি-৪, ব্যানানা আমের গাছ রোপন করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নাটোর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল ইসলাম খান বাসসকে বলেন, পুরনো আম বাগানের বড় গাছের ফলন কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ওইসব গাছ কাটা হলেও উচ্চ মূল্য আম চাষে কৃষকের আগ্রহ আছে।
আবার আম চাষের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে এক বিঘাতে সাতটি করে আম গাছ রোপন করা হলেও নতুন ঘন পদ্ধতিতে এক বিঘায় ২৫টি করে আম গাছ রোপন করা হচ্ছে। তবে সার্বিকভাবে কৃষি বৈচিত্র্যকরণের ফলে কৃষকরা উচ্চ মূল্যের ফসলের প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। এর ফলে অন্য ফল বা শস্য আবাদে কৃষকদের আগ্রহ লক্ষণীয়।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, আমের পাশাপাশি অনুকূল আবহাওয়া এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতির কারণে নাটোরে আখ ও ভুট্টার ফলন বেশ ভালো হচ্ছে, যা জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।