শিরোনাম

॥ রেদ্ওয়ান আহমদ ॥
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : দু’টো পদকের ছবি এখনো তার ফেসবুক টাইমলাইনে ‘পিন পোস্ট’ করে রাখা। একটি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিক্সে ৮০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হওয়ার আনন্দমুহূর্ত, আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটারে প্রথম আর ৫ হাজার মিটারে দ্বিতীয় হওয়ার গর্বের স্মৃতি।
প্রথম পদকপ্রাপ্তির দিন উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘যাই হোক জীবনে প্রথম কোনো বড় ইভেন্টে পদক পেলাম।’ কিন্তু কে জানত, এই দু’টি পোস্টই হয়ে থাকবে তার শেষ অর্জনের সাক্ষী। এরপর আর কোন পদকই কখনো জমা হবে না তার ঝুলিতে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে শহীদ আবদুর রব হলের মূল ফটকে একটি ব্যানার টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
মুহূর্তের মধ্যে সব শেষ :
শহীদ আবদুর রব হলের গেটে একটি ব্যানার টাঙাতে গিয়ে ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এসময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিনি নিচে পড়ে যান। দ্রুত তাকে নেওয়া হয় বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারে। কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন, কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পথেই রাত ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
একজন প্রত্যক্ষদর্শী আবাসিক শিক্ষার্থী সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা তখন হল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আরিফুল হল গেটের উপর দাঁড়িয়ে ব্যানার টাঙাচ্ছিলো। আমরা দাঁড়িয়ে দেখতেছিলাম। হঠাৎ সে একটু কাঁপাকাঁপি শুরু করলো। প্রথমে ডান হাতটা পড়ে গেছে, এরপর বাম হাতটাও। তারপর পাশের পিলারে সে বাড়ি খেয়ে গেটের পাশেই একটা ছোট ঘরের উপর পড়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই যেন সবকিছু হয়ে গেলো।’
আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার পর মেইন সুইচ অফ করার আগেই সে বাড়ি খেয়ে পড়ে গেছে। তারপর আমরা ওখান থেকে তাকে ধরে নামাই। নামানোর সাথে সাথে দেখলাম, ওর প্যান্ট প্রস্রাবে ভিজে গেছে এবং সে সেন্সলেস, কোনো কথা বলছে না। পরে আমরা দ্রুত ই-কারে করে চবি মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে গেলাম। ওখানে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই ডাক্তার ওকে অক্সিজেন দেয়।’
চবি মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. আবু তৈয়ব বলেন, ‘যখন আমাকে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন করা হয়, তখন ১০টার মতো বাজে। অ্যাম্বুলেন্স তৈরিই ছিল, তাই আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে গাড়ির লোকেরা যেভাবে বলছে, তাতে মনে হচ্ছে, দুর্ঘটনাটি ঘটার পর স্পটেই তার মৃত্যু হয়েছে।’
যে ব্যানারই কেড়ে নিলো জীবন :
নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, যে ব্যানারটি টাঙাতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি ছিল আরিফুলের বিভাগেরই এক সিনিয়র অ্যাথলেট মুশফিকুর রহমান মামুনের ১০০ দিনে ১ হাজার কিলোমিটার রানিং চ্যালেঞ্জ’ শুরুর একটি ব্যানার। যে সিনিয়রের সাথে তার সখ্যতা ছিলো অন্যরকম। একজন সহ-অ্যাথলেটের নতুন চ্যালেঞ্জ প্রচারের জন্য যে ব্যানার হাতে তুলে নিয়েছিলেন আরিফুল, সেই ব্যানারই শেষ পর্যন্ত কেড়ে নিলো তার জীবন।
এই ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েছেন মুশফিকুর রহমান মামুন নিজেও। আরিফুলের আকস্মিক মৃত্যুতে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন তিনি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কাঁপা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমি হাসপাতালে আছি। কথা বলার মতো পরিস্থিতিতে নাই, ভাই।’
দৌড়ই ছিল যার নেশা:
আরিফুল ছিলেন একজন নিয়মিত অ্যাথলেট। তার ফেসবুক টাইমলাইনে চোখ রাখলেই বোঝা যায় দৌড়ের প্রতি তার নিবেদনের কথা। নিয়মিত অনুশীলনের ভিডিও এবং অন্য অ্যাথলেটদের দৌড়ের ভিডিও শেয়ার করাই ছিল তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় শহীদ আবদুর রব হলের হয়ে ৮০০ মিটার দৌড়ে প্রথম এবং ৫ হাজার মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। এমনকি আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিক্সে চবির প্রতিনিধিত্ব করে ৮০০ মিটার ইভেন্টে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিলেন আরিফুল, যা তার কাছে ছিল জীবনের প্রথম বড় অর্জন।
একজন সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটের অকালমৃত্যু শোকের ছায়া ফেলেছে পুরো ক্যাম্পাসে। যে তরুণ দৌড়ে নিজের জীবনের গতি খুঁজে পেয়েছিলেন, বিদ্যুতের একটি নিষ্ঠুর ঝলকানি থামিয়ে দিলো তার সব স্বপ্ন, সব সম্ভাবনা।
প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুর দায় কার?
এদিকে হলের মূল ফটকের বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ত্রুটির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা। ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মুনতাজ আলী বলেন, ‘আরিফের এই মৃত্যু নিছক ‘দুর্ঘটনা’ বলে যেন হারিয়ে না যায়। প্রশ্ন উঠুক, তদন্ত হোক, দায় নির্ধারণ হোক। কারণ, আরিফের মতো আর কোনো শিক্ষার্থী যেন পাহাড়ি ক্যাম্পাসের মায়ার গোপন মৃত্যুফাঁদে আটকে মৃত্যুর মুখোমুখি না হয়।’