বাসস
  ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১৯:১৯

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতা পরিহারের আহ্বান ইউজিসি চেয়ারম্যানের

ছবি : বাসস

ঢাকা, ৪ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতা পরিহার করতে সকলের প্রতি আহবান জানয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কারণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিপীড়ন, বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার হয়েছেন এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমাশীলতা, সংলাপ ও ন্যায়ভিত্তিক পুনর্মিলনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে সমাজের অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না।

আজ মঙ্গলবার জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, মুক্তবুদ্ধি, ভিন্নমত ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের পতনই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; প্রকৃত অর্জন হবে তখনই, যখন জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।’

শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের অবশিষ্ট কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ চলমান রয়েছে। অবশিষ্ট কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট অনেকাংশে দূর হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা ইউজিসির অন্যতম অগ্রাধিকার। শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, দেশের সব পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ এবং দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কমিশন কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন আরও সহজ ও নির্বিঘ্ন করতে ইউজিসি পাঁচ বছর মেয়াদি উচ্চশিক্ষা রূপান্তর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে নতুন রাষ্ট্রগঠনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ন্যায্যতা, সাম্য ও জবাবদিহির ভিত্তিতে দেশ গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, জুলাই আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছেন। একইভাবে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান জাতি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।

তিনি বলেন, তরুণদের আত্মত্যাগের ফলে দেশে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। যাঁরা জীবন দিয়েছেন, আহত হয়েছেন কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। সেই আত্মত্যাগের চেতনাকে ধারণ করে ন্যায়, জবাবদিহি ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে কাজ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে তারা মর্যাদা, সহমর্মিতা ও ন্যায্য আচরণ পাবে। ১৭-১৮ বছর বয়সী একজন শিক্ষার্থী অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। তাদের আবেগ, সম্ভাবনা ও ভুল করার সুযোগকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী হতাশায় না ভোগে এবং সেই হতাশা ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতার কারণ না হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইকবাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মঞ্জুর মুর্শেদ ভূঁইয়া এবং সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ইমরানুল হক। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জুলাই আন্দোলনে শহিদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী একরামুল হক সাজিদের মা লিপি বেগম। তিনি তাঁর সন্তানের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

অনুষ্ঠানে ‘জুলাই আন্দোলন: সংগ্রামের চিত্রমালা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (বহিরাঙ্গন কার্যালয়) অধ্যাপক ড. নাছির আহমাদ।

এছাড়া আলোকচিত্রী জীবন আহমেদের ‘জুলাই আন্দোলন: সংগ্রামের চিত্রমালা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান।

সভাপতির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দীন বলেন, জুলাই আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। 

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও পরিবহনসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসন কাজ করছে। বৈষম্য দূর করে নিয়োগসহ সব ক্ষেত্রে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হবে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মো. শেখ গিয়াস উদ্দিন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশ নেন।