বাসস
  ২২ মে ২০২৬, ১৪:১১
আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ১৪:২৫

রক্তশূন্যতার দুষ্টচক্রে কিশোরী থেকে গর্ভবতী নারী

ঢাকা, ২২ মে, ২০২৬ (বাসস) : আফসানা রাখি, বয়স ৩৫ বছর। একটি বিপনী প্রতিষ্ঠানের ক্যাশিয়ার। 

সারাবছরই মাথা ঝিমঝিম, দুর্বলতা, খাবারে অরুচি আর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন বছরের অধিকাংশ সময়। ঋতুস্রাব ছাড়াই হঠাৎ একদিন রক্তক্ষরণ, জরুরিভিত্তিতে ভর্তি হন রাজধানীর নামীদামী একটি বেসরকারি হাসপাতালে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি রক্তশূন্যতায় ভুগছেন। আর এই রক্তশূন্যতার কারণ তিনি এন্ডোমেট্রিওসিস নামক জরায়ুর অতি বেদনাদায়ক ও জটিল রোগে ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি অনিয়মিত ঋতুস্রাবের পাশাপাশি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ সমস্যায় ভুগে থাকেন। আফসানা রাখির মত শহুরে উচ্চশিক্ষিত নারীর পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ নারীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন এন্ডোমেট্রিওসিস নামক রোগে। নারীর কিছু রোগ যেমন- পলিমেনোরিয়া, এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিইউবি ইত্যাদিতে রক্তক্ষরণের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এতে দেশে রক্তশূন্যতায় ভোগা নারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাতীয় পুষ্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ঋতুকালীন বয়সের অর্থাৎ ১২-৪৯ বছর বয়সী নারীর ২৮.৯ শতাংশ সাধারণভাবে রক্তশূন্যতায় ভুগে। অন্যদিকে গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে এই হার ৩৭ শতাংশ। 

বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে বসবাসকারী নারীর রক্তশূন্যতার মধ্যেও পার্থক্য আছে। শহুরে নারীর ৩১ শতাংশ এবং গ্রামীণ নারীর ৪৪ শতাংশ রক্তশূন্যতায় ভোগে।

রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া হলো রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। 

মূলত প্রতি মাসে ঋতুস্রাব, ল্যাকটেশন বা মাতৃদুগ্ধ উৎপাদন প্রক্রিয়া ও গর্ভধারণের কারণে নারীদের রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের ৩০ শতাংশ এবং ৩৭ শতাংশ গর্ভবতী নারীর রক্তশূন্যতা থাকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী রক্তশূন্যতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘মানুষের শরীরের রক্তে লোহিতকণিকা নামের এক ধরনের কোষ রয়েছে। এই কোষে হিমোগ্লোবিন নামের একটি বিশেষ পদার্থ আছে। 

হিমোগ্লোবিনের দুটি অংশ- একটির নাম হিম যা লৌহ এবং অন্যটির নাম গ্লোবিন যা প্রোটিন দ্বারা তৈরি। রক্তে হিমোগ্লোবিন, বিশেষ করে হিম বা লৌহ কমে যাওয়াকে রক্তস্বল্পতা, রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়া বলে। 

প্রকৃতিগতভাবে পুরুষের তুলনায় নারীর শরীরে হিমোগ্লোবিন কিছুটা কম থাকে।’

তিনি বলেন, নারীর রক্তশূন্যতার প্রধান কারণ মাসিক ঋতুস্রাব। প্রতিটি ঋতুস্রাবের সময় সাধারণত ৩৫-৪৫ মিলি রক্ত শরীর থেকে বের হয়। তবে এই পরিমাণ ৮০ মিলি পর্যন্ত হতে পারে। এজন্য একজন নারীকে এই ক্ষতিপূরণের জন্য অতিরিক্ত আয়রন আছে এমন খাদ্য খাওয়া উচিত। এছাড়া নারীর কিছু রোগ যেমন- পলিমেনোরিয়া, এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিইউবি ইত্যাদিতে রক্ত হারানোর পরিমাণ বেড়ে যায়। তখন অতিরিক্ত আয়রন সমৃদ্ধ খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণ না করলে রক্তশূন্যতার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীর শরীরে রক্তের পরিমাণ অনেক বাড়ে। তখন বাড়তি আয়রনের দরকার হয়। সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়কালে মায়ের শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের দরকার হয়। এসময় গুলোতে আয়রন সমৃদ্ধ খাদ্য না পেলে নারীর রক্তশূন্যতা হয়। এছাড়া কিছু হিমোগ্লোবিনের অসুখ যেমন- থ্যালাসেমিয়া ইত্যাদিতেও রক্তশূন্যতা থাকে। আমাদের পরিবারগুলোতে নারীর পুষ্টির বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে। নারীর রক্তশূণ্যতার এটাও একটি অন্যতম কারণ। রক্তশূন্যতা ও এর জটিলতা এড়াতে হলে নারীকে আয়রন সমৃদ্ধ পুষ্টিকর ও সুষম খাবার দিতে হবে। নারীর যেকোন রোগের দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে। নারীকে মাঝে মাঝে কৃমিনাশক ঔষধ খাওয়াতে হবে। কমিউনিটি ক্লিনিক, মেডিকেল সাব-সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য প্রকল্পসহ সব ধরণের সাধারণ হাসপাতালে গর্ভবতী নারীকে আয়রন ট্যাবলেট বিনামূল্যে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই সেবা নিতে প্রচারণা প্রয়োজন।

নারীর স্বাস্থ্য বিশেষ করে গর্ভকালীন স্বাস্থ্যের বিষয়ে মানুষের সচেতনতা ক্রমশ বাড়ছে। তবে দারিদ্র্য ও কুসংস্কারের কারণে এখনো অনেক নারী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যায় না। এজন্য প্রচুর করতে হবে বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

জনসচেতনতা বাড়াতে এক লেখায় গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. ইসরাত জাবীন বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরির কাঁচামাল আয়রন কমে গেলে আয়রন ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা হতে পারে। এ ছাড়া ভিটামিন বি ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি, দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ক্যান্সার, অস্থিমজ্জার সমস্যা, থাইরয়েডের সমস্যা, সময়ের আগে রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়া বা থ্যালাসেমিয়া ইত্যাদি কারণে রক্তশূন্যতা হয়ে থাকে।’

তিনি বলেন, যদি এই অতিরিক্ত পুষ্টির চাহিদা পূরণ না হয়, তাহলে মা ও শিশু দুজনের জন্যই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। এ ছাড়া অপুষ্টি, কৃমি সংক্রমণ, দীর্ঘ মেয়াদে ব্যথার ওষুধ সেবনে পাকস্থলীতে ক্ষত, জরায়ুর টিউমার, কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে পায়খানার সঙ্গে রক্তক্ষরণ, পাইলসসহ নানা কারণে আয়রনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। 

গর্ভাবস্থায় ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি হয় এবং তা সাপ্লিমেন্ট হিসেবে খাওয়া উচিত। ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যায় সবুজ ও রঙিন শাকসবজিতে। আমাদের দেশের অনেক নারী জানেন না যে তাদের মৃদু ধরনের জিনগত রক্তরোগ যেমন থ্যালাসেমিয়া বা হিমোগ্লোবিন ই ট্রেইট আছে কি না। নারীদের হিমোগ্লোবিন একটু কম থাকে। 

হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস নামে পরীক্ষা করলে তা শনাক্ত করা যায়।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তিবোধ, ত্বক ও ঠোঁট ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া, অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা বা শ্বাসকষ্ট হওয়া ইত্যাদি রক্তশূন্যতার লক্ষণ। রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হলে প্রথমে জানতে হবে এটি কতটা তীব্র। এরপর নেপথ্য কারণ খুঁজে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তশূন্যতা এড়াতে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কচু ও কচুশাক, পালংশাক, কলিজা, কাঁচা কলা ও খেজুরে প্রচুর পরিমাণ আয়রন থাকে। তবে অনেক সময় খাবারের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণ না হলে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা রক্ত সঞ্চালন করাও লাগতে পারে।

‘বাংলাদেশে পুষ্টি খাতে বিনিয়োগ : প্রয়োজনীয়তা, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ’ শিরোনামে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আলোচনায় উঠে আসে, দেশে শৈশবকালীন অপুষ্টি এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। গত এক দশকে পুষ্টি খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও খর্বকায় ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত আর নেপালের পর বাংলাদেশ। কিশোরী মেয়েদের গর্ভধারণের হারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। প্রতি হাজারে ১১৩ জন কিশোরী ১৯ বছর বয়সের আগে মা হচ্ছে। এসব বিষয় দেশে অপুষ্টিজনিত বড় বোঝা তৈরি করছে।

নিউট্রিশন ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিশু, কিশোরী ও নারীদের মধ্যে খর্বকায় ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে বিনিয়োগ বাড়ালে বাংলাদেশ কমপক্ষে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বাঁচাতে পারে, যা দেশের মোট দেশজ আয়ের (জিএনআই) ২ দশমিক ৮ শতাংশ। পুষ্টি শুধু স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে না, এটা অর্থনৈতিক উৎপাদন, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নেও প্রভাব ফেলে। তাই পুষ্টির বিষয়টি অন্যান্য খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কৈশোরকালীন পুষ্টি কার্যক্রমের আওতায় স্কুলে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের আয়রন ফলিক অ্যাসিড (আইএফএ) ট্যাবলেট বিতরণের জন্য এ খাতে আলাদা বরাদ্দ রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়।

২০২৩-২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে নারীদের রক্তশূন্যতার বর্তমান পরিস্থিতি ও কারণ তুলে ধরা হলো- প্রজননক্ষম নারীর (১৫-৪৯ বছর) প্রায় ৩৭-৪০ শতাংশ রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত। গর্ভবতী নারীর প্রায় ৫০ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। কিশোরী মেয়েদের প্রায় ৩৮ শতাংশ রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের মধ্যে গর্ভধারণের হারও বেশি। অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত গর্ভবতী নারীদের মধ্যে রক্তশূন্যতার হার  অনেক বেশি (প্রায় ৭১ শতাংশ)।

কেন নারীরা রক্তশূন্যতায় বেশি ভোগেন- 
আয়রনের ঘাটতি: খাদ্যাভ্যাসে পর্যাপ্ত আয়রনসমৃদ্ধ খাবার (যেমন- লাল শাক, কলিজা, ডাল) না থাকা। 

মাসিক বা ঋতুস্রাব: প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের কারণে রক্তক্ষরণ আয়রনের ঘাটতি তৈরি করে।

গর্ভাবস্থা ও প্রসব: গর্ভাবস্থায় আয়রনের চাহিদা বাড়ে এবং প্রসবের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তা রক্তশূন্যতার কারণ হয়।

অল্প বয়সে বিয়ে ও ঘন ঘন গর্ভধারণ: বাংলাদেশে ১৯ বছর বয়সের আগে মা হওয়ার হার বেশি, যা শরীরকে পুষ্টিহীন করে তোলে।

কৃমি সংক্রমণ: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে কৃমি সংক্রমণ, যা শরীর থেকে রক্ত চুষে নেয়। 

রক্তশূন্যতার লক্ষণ: অতিরিক্ত ক্লান্তি এবং দুর্বলতা। শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া। মাথা ঘোরা এবং মাথাব্যথা। 

নিশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া বা বুক ধড়ফড় করা। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া। 

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ফলাফল: গর্ভবতী মায়ের ক্ষেত্রে অকাল প্রসব, গর্ভপাত এবং কম ওজনের শিশু জন্ম হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

কাজের ক্ষমতা: উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। 

শারীরিক ও মানসিক বিকাশ: কিশোরীদের ক্ষেত্রে শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয়। 

প্রতিকার ও পুষ্টি: আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন- পালং শাক, চুকান্দার, লাল মাংস, কলিজা, ডাল, বাদাম এবং শুকনো ফল খাওয়া। 

ভিটামিন সি: ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার (লেবু, কমলা, পেয়ারা) আয়রন শোষণে সাহায্য করে, তাই আয়রনের খাবারের সাথে এগুলো খাওয়া প্রয়োজন।

আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড ট্যাবলেট: গর্ভবতী ও প্রজনন