বাসস
  ১৭ মে ২০২৬, ১০:২১

শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আমেনা বেগমের অদম্য জীবনের গল্প

ঢাকা, ১৭ মে, ২০২৬(বাসস) : কৈশোরেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল আমেনা বেগমকে। অল্প বয়সে বিয়ে, খুব দ্রুত মাতৃত্ব, সংসার ভাঙার কষ্ট, দারিদ্র্য আর সামাজিক নানা বাধা-সব মিলিয়ে তার জীবন শুরু হয়েছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তবে হার মানেননি তিনি। প্রতিকূলতাকে শক্তিতে রূপ দিয়ে আজ তিনি একজন আত্মনির্ভরশীল পোশাক শ্রমিক, যিনি নিজের পরিশ্রম আর দৃঢ়তায় বদলে দিয়েছেন জীবনের গল্প।

বর্তমানে গাজীপুরের হোপ ল্যান্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডে মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন আমেনা। নিজের উপার্জনে তিনি শুধু সংসারই চালাচ্ছেন না, বৃদ্ধ বাবা ও এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলের ভবিষ্যৎও গড়ে তুলছেন অদম্য সাহস আর ভালোবাসা দিয়ে।

সম্প্রতি গাজীপুর মহানগরের গাজীপুরা এলাকায় নিজ কারখানার পাশেই নিজের ভাড়া বাসায় বসে এই প্রতিবেদককে বলছিলেন নিজের এগিয়ে যাওয়ার গল্প। অনেকটা শূন্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর কথা।  

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চৌদিঘি গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম আমেনার। পাঁচ ভাই-বোনের সংসারে ছোট থেকেই অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে চতুর্থ শ্রেণির পরই থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন। কিন্তু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আক্ষেপকে তিনি পরিণত করেছেন ছেলের স্বপ্ন পূরণের অনুপ্রেরণায়।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় আমেনা বেগমকে। ১৮ বছর বয়সে মা হন, আর এক বছর পরই ভেঙে যায় সংসার। স্বামীর দায়িত্বহীনতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও নির্যাতনের মধ্যে থেকেও তিনি ভেঙে পড়েননি। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাহসী সিদ্ধান্ত নেন নতুন করে জীবন শুরু করার।

বিচ্ছেদের পর কিছুদিন বাবার বাড়িতে থাকলেও অভাবের কারণে সেখানে দীর্ঘদিন থাকা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে সন্তানকে মায়ের কাছে রেখে কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসেন আমেনা। সেই সময়টা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন পথচলা।

কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০১৬ সালে একটি পোশাক কারখানায় হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন আমেনা। প্রথমদিকে কাজ শেখা, নতুন পরিবেশে টিকে থাকা সবই ছিল কঠিন। কিন্তু ধৈর্য আর পরিশ্রমে ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে ওঠেন। একসময় হেলপার থেকে হয়ে ওঠেন দক্ষ মেশিন অপারেটর।

শুরুতে তার বেতন ছিল মাত্র ৫ হাজার ৬০০ টাকা। বর্তমানে তিনি মাসে ১৬ হাজার ৪০০ টাকা বেতন পান, সঙ্গে রয়েছে ওভারটাইম সুবিধা। এই আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলছে তার পুরো সংসার।
 
আমেনার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ছেলে আমিনুর রহমান হৃদয়। বর্তমানে উত্তরা এলাকার একটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ছে হৃদয় এবং এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো তিনি ছেলের মধ্যে বুনে দিয়েছেন। তার একটাই লক্ষ্য- ছেলে যেন শিক্ষিত হয়ে ভালো মানুষ হতে পারে।
 
ছেলেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে আমেনা বলেন,‘আমার নিজের কোনো স্বপ্ন নেই। এখন একটাই স্বপ্ন ছেলেকে মানুষ করা। আমি যা পারিনি, সে যেন তা করতে পারে। ও ভালো কিছু করতে পারলেই আমার জীবন সার্থক।’

অভাবের সংসারে প্রতিটি খরচের বেলায়ই খুব হিসাব করে চলতে হয় তাকে। নিজের ছোট ছোট ইচ্ছাগুলোও ত্যাগ করেন ছেলের ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু তাতেও কোনো আক্ষেপ নেই আমেনার। বরং সন্তানের সাফল্যেই তিনি খুঁজে পান জীবনের পূর্ণতা।

শুধু সন্তানের দায়িত্ব নয়, বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনার দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছেন আমেনা। নিজের কষ্টার্জিত টাকায় বাবার জন্য গরু কিনেছেন, জমি কিনেছেন এবং অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার খরচও বহন করেছেন।

সংসার ভাঙার পর একাধিকবার বিয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি আর নতুন সংসারের কথা ভাবেননি। কারণ তার কাছে সন্তানের ভবিষ্যৎই ছিল সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

প্রতিদিন ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে রান্না, নামাজ, তারপর কারখানার কাজ- এভাবেই কাটে তার দিন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা শেষে বাসায় ফিরে আবার সংসারের সব দায়িত্ব সামলান একাই।

কঠোর পরিশ্রম আর দায়িত্ববোধই যেন তার জীবনের মূল শক্তি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্য নারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জীবনে একটা কিছু হারালেই সব শেষ হয়ে যায় না। নতুন করে শুরু করা যায়। ধৈর্য ধরতে হবে, নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।’
 
আমেনা বেগমের গল্প শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়, এটি সাহস, আত্মবিশ্বাস আর ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণার গল্প। তার মতো অসংখ্য নারী শ্রমিক প্রতিদিন নীরবে লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছেন, নিজেদের ও পরিবারের জন্য গড়ে তুলছেন নতুন সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ।