বাসস
  ১৬ মে ২০২৬, ১৮:৫৭
আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ১৯:৫৮

চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ওষুধ বিক্রি, স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নারীরা

ছবি : সংগৃহীত

ঢকা ১৬ মে, ২০২৬ (বাসস) : রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকার বাসিন্দা শারমিন জামান (৩৮)। স্বামী জামান ইকবাল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। বড় সন্তানের বয়স ১৪, দ্বিতীয়টার বয়স ১২, তৃতীয় সন্তানের বয়স ৭। হঠাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে গর্ভে সন্তান এলে স্বামীকে না জানিয়েই গোপনে গর্ভপাত করানোর সিদ্ধান্ত নেন শারমিন। প্রতিবেশী এক ভাবির পরামর্শে পাড়ার ওষুধের দোকান থেকে বাচ্চা নষ্ট করার ওষুধ কিনে খান তিনি। ওষুধটি খাওয়ার ২ ঘন্টা পরই পেটে ব্যথা শুরু হয়। রাত যত গভীয় হয় ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। ভোর হতেই রক্তপাত শুরু হয়। কিছুতেই রক্তপাত বন্ধ না হওয়ায় এক চিকিৎসক আত্মীয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে ভর্তি হন। রোগীর অবস্থা বেগতিক দেখে চিকিৎসকরা দ্রুত তাকে ওটিতে নিয়ে অস্ত্র পাচার করতে বাধ্য হন। ঘটনাটি গত ১৮ ডিসেম্বরের। চিকিৎসকদের সঠিক চিকিৎসায় শারমিন জামান এ যাত্রায় বেঁচে যান।

শারমিন জামানের আত্মীয় স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ফারজানা চৌধুরী বলেন, তিনি সাইটোমিস নামের যে ওষুধ খেয়েছিলেন, তার শ্রেণীগত (জেনেরিক) নাম মিসোপ্রোস্টল। ওষুধটি তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিনা ব্যবস্থাপত্রে কিনেছিলেন। যেটা তার ঠিক হয়নি। প্রচুর রক্ত গেছে। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না পেলে তার মৃত্যুও হতে পারতো। তিনি বলেন, ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই অনেক নারীই হরহামেশা ফার্মেসী থেকে মিসোটল, এম এম কিট, সাইটোমিস কিট এই ধরনের অনেক ওষুধই কিনছেন এবং ভুলভাবে ব্যবহার করছেন।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম জানান, এই ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে, জীবনেরও ঝুঁকি আছে। তাই ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া এই ওষুধ বিক্রি করা কোনোভাবেই উচিত নয়। ফার্মেসিগুলোতে হরহামেশা এমআরের ওষুধও বিক্রি হচ্ছে। এ কারণে অনেক মাতৃমৃত্যু হচ্ছে। মিসোপ্রোস্টল জরায়ু সংকুচিত করে। সে কারণে এই ওষুধ প্রসববেদনা তুলতে সাহায্য করে। আবার নির্দিষ্ট মাত্রায় এ ওষুধ প্রয়োগ করলে জরায়ু বেশি সংকুচিত হয়ে প্রসব পরবর্তী রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়। তারা দুটি কাজেই এই ওষুধ ব্যবহার করছেন। এই চিকিৎসক আরো বলেন, শহরের গলিতে, বস্তিতে বা গ্রামের ওষুধের দোকানে মিসোপ্রোস্টল অহরহ বিক্রি হচ্ছে। নারীরা না বুঝেই ওষুধগুলো কিনছেন, খাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই বিপদে পড়ছেন। অসম্পূর্ণ গর্ভপাত বা গর্ভপাতজনিত জটিলতা নিয়ে নিয়মিত বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি) হাসপাতালে রোগী আসছে। ব্যক্তিগত চেম্বারেও নিয়মিত রোগী পান তিনি। এই চিকিৎসকের মতে, গর্ভধারণসহ নানা কারণে নারীর মাসিক বন্ধ হতে পারে। মাসিক নিয়মিতকরণের জন্য গর্ভ নষ্ট করলে তা আসলে গর্ভপাতই।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ডিএমসিএইচ) পরিচালকের দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ ৬ মাসে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগে প্রায় ১ হাজার জন রোগী এসেছিলেন গর্ভপাতজনিত জটিলতা নিয়ে। তবে জটিলতার কারণ মিসোপ্রোস্টল কি না, সে তথ্য নেই।

রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার ফার্মেসী ঘুরে দেখা গেছে, ওটিসি তালিকার বাইরেও প্রেসক্রিপশন ছাড়া হরহামেশা বিক্রি করছে ওষুধ। ওটিসি তালিকার বাইরে ওষুধ কিনতে গেলে, প্রেসক্রিপশন নেয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানছে না ক্রেতা-বিক্রেতা কেউই।

রোগ নিরাময়ে ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওষুধ ক্রয় ও গ্রহণে রয়েছে সুনির্দিষ্ট নীতিমালাও। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ওটিসি বা ওভার দ্যা কাউন্টার তালিকাভুক্ত ওষুধ বিক্রিতে কোনো প্রেসক্রিপশনের বাধ্যবাধকতা না রাখলেও বাকি ওষুধ বিক্রিতে প্রেসক্রিপশন জরুরি করেছে। আর যারা ওষুধ বিক্রি করবেন তাদেরও সার্টিফিকেট ও দোকান লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে অধিদপ্তর। কিন্তু কতটা মানা হচ্ছে এসব নিয়ম বা আইন।

আমাদের দেশে এসিডিটি বা গ্যাসের ওষুধ খাওয়ার প্রচলন অনেক বেশি। কিন্তু এই গ্যাসের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুবই ক্ষতিকর। কেউ যদি টানা দুই বছর গ্যাসের ওষুধ সেবন করে থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রে তার অস্টিওপোলেসি ডেভলপ করে। এছাড়া আমাদের দেশের বেশিরভাগ ফার্মেসিগুলোতে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ঘুমের ওষুধ বিক্রি করা হয়। এর ফলে কোনো ব্যক্তির দিনের পর দিন ঘুমের ওষুধ খাওয়ার ফলে ঘুমের ওষুধের প্রতি ডিপেন্ডেন্সি বা নির্ভরতা বেড়ে যায়। এভাবে একসময় তার মনে হয়, ঘুমের ওষুধ ছাড়া তার ঘুম হবে না। এর ফলে ঘুমের ওষুধের প্রতি তার নির্ভরতা অনেক বেড়ে যায়।

এভাবে সেল্ফ মেডিকেটেড হয়ে ওষুধ খাওয়ার ফলে লিভার এবং কিডনি ফেলিওর ডেভেলপ করে। এই অবস্থায় চিকিৎসকদের কাছে গেলে চিকিৎসকদেরও রোগের উপসর্গ অনুযায়ী ট্রিটমেন্ট করতে অসুবিধা হয়। তাই স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে মানুষকে বাঁচাতে ফার্মেসিগুলোকে আইনের আওতায় এনে সঠিক ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আইরিন বিনতে সাত্তার বলেন, আমার কাছে শতকরা ৬ থেকে ৮ জন আসেন ওষুধ খেয়ে বিপদে পড়ে। এক্ষেত্রে ঠিক মাত্রায় নিয়ম মেনে ওষুধ না খেলে ভ্রূণের কিছু অংশ জরায়ুতে থেকে যায়। ফলে হঠাৎ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে অনিয়মিতভাবে দুই-আড়াই মাস ধরে তা চলতে পারে। কয়েকবার এমন হলে গর্ভধারণক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে। অনেক সময় ভ্রূণ জরায়ুতে না থেকে গর্ভনালিতে থাকে। মা যদি প্রস্রাব পরীক্ষা করিয়ে গর্ভপাতের জন্য দোকান থেকে কিনে ওষুধ খান, তাতে কাজ হবে না। ভ্রূণ বড় হতে থাকবে। গর্ভনালি ফেটে মৃত্যুও হতে পারে।

তিনি বলেন, অল্পবয়সী অনেক ভুক্তভোগী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারই করেন না। তারা গর্ভধারণের পর এমআর অথবা গর্ভপাত করান। এমএম কিট বা মিসোপ্রোস্টল সেবনকেই তারা জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে নেন। এক্ষেত্রে চিকিৎসক আইরিনের সুপারিশ, পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে সহজলভ্য করতে হবে। অন্যদিকে, সরকারি কর্মসূচিতে এমএম কিট কেনা বাড়াতে হবে। দেশে এখন বছরে প্রায় ১০ লাখ এমএম কিটের চাহিদা আছে।

কেবল মায়ের জীবন বাঁচানোর প্রয়োজন ছাড়া বাংলাদেশে গর্ভপাত অবৈধ। অন্যদিকে দেশে মাসিক নিয়মিতকরণ বৈধ। এমআর জরায়ু পরিষ্কার করে। এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রূণও বেরিয়ে যেতে পারে। জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে ১৯৭৯ সাল থেকে এমআর অন্তর্ভুক্ত আছে।

সরকারের ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, দেশে ২১টি কোম্পানি মিসোপ্রোস্টল বানায়। বাজারে চলে এমন কতগুলো ব্র্যান্ড হচ্ছে মিসোটল, সাইটোমিস, আইসোভেন্ট, মিসোপা ও জি-মিসোপ্রোস্টল। প্রসব এবং মাসিক নিয়মিতকরণের জন্য (এমআর) ওষুধটির ব্যবহার বৈধ। তবে তা উপযুক্ত স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে। প্রজনন বয়সী কোনো নারীর মাসিক বন্ধ হওয়ার ৬ সপ্তাহ পর থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি আইনত এমআর করাতে পারেন। আগে যন্ত্র দিয়ে জরায়ু পরিষ্কার করে এমআর করা হতো। এক্ষেত্রে ২০১৩ সাল থেকে ওষুধও ব্যবহৃত হচ্ছে।

গর্ভপাত অবৈধ। সুতরাং সরকার গর্ভপাতের কোনো পদ্ধতি বা নির্দেশনা দেয় না। এমআরের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি সম্পর্কে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর পরিপত্র জারি করেছে।

নারী সংগঠন নারীপক্ষ ২০২০ সালে গর্ভপাত নিয়ে একটি গবেষণা করেছে। সেখানে উদ্ধৃত ২০১৪ সালের একটি হিসাবে দেখা যায়, সে বছর আড়াই লাখের বেশি নারীর গর্ভপাতজনিত চিকিৎসা লেগেছে। এদের প্রায় অর্ধেকের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়েছিল। আর সেটার কারণ ছিল মিসোপ্রোস্টলের ভুল ব্যবহার।

ওষুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, মিসোপ্রোস্টল বিক্রির কড়াকড়ির কোনো বিধিনিষেধ তারা পাননি। ওষুধ বিক্রিতে অনিয়মের নজরদারি করা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের একটি কাজ।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওষুধটির ক্ষতিকর প্রভাব বা অপব্যবহার নিয়ে পেশাজীবী চিকিৎসকদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ বা তথ্য পেলে অধিদপ্তর ব্যবস্থা নেবে, যেমন নিয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে।

এ ধরনের ওষুধ ব্যবহারের ঝুঁকির দিক বিবেচনা করে নারীদের এমআর সেবা এবং নিরাপদ সময়সীমা সম্পর্কে সচেতন করা দরকার। এ ছাড়া দোকানমালিকদের মিসোপ্রোস্টল এবং এর অনুবর্তী মিফেপ্রিস্টনের ব্যবহারবিধি আর ঝুঁকি সম্পর্কে জানাতে হবে। অপব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে ক্রেতাদের সতর্ক করতে প্রচার-প্রচারণা প্রয়োজন। দোকানগুলোতে এ সংক্রান্ত পোস্টার ও লিফলেট থাকতে হবে।