শিরোনাম

ঢাকা, ১৬ মে, ২০২৬(বাসস): মালিহা ইসলামের ছেলে রাফিনের বয়স ১৫ বছর। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা যে কোন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ছেলেকে নিয়ে গেলে মালিহাকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। দিনভর মালিহার দুশ্চিন্তা তিনি যখন থাকবেন না, তখন এই ছেলের কী হবে!
মগবাজার রেললাইন এলাকার সুইড বাংলাদেশের ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে কথা হয় মাহিলা ইসলামের সঙ্গে। সেদিন তিনি তার এ আতংকের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন।
তিনিসহ বিশেষ শিশুদের স্বজনেরা জানান, অটিজমে আক্রান্ত কোনো কোনো শিশু বা অটিস্টিক শিশু কখনো কখনো বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শিতা দেখাতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা অত্যন্ত মেধাবী হয়। তবে সাধারণ শিশুর মত এদের মেধা সবদিকে সমান থাকে না। এদের কেউ গণিতে, কেউ বিজ্ঞানে, কেউ বা ছবি আঁকায় অসাধারণ দক্ষতা দেখাতে পারে। কেউ আবার মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী হয়।
পরিবার ও সমাজের সহানুভূতি ও সঠিক তত্ত্বাবধানে অটিস্টিক শিশুরাও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ দক্ষ একজন। অনেকেই মনে করেন, বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ও আইনস্টাইন অটিস্টিক ছিলেন।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুর বিকাশজনিত একটি সমস্যা অটিজম। অটিজম কোনো বংশগত বা মানসিক রোগ নয়। এটা একধরনের স্নায়ুগত বা মানসিক সমস্যা। এ সমস্যাকে ইংরেজিতে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার বলে। অটিজমকে সাধারণভাবে শিশুর মনোবিকাশগত জটিলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা সমাজের জন্য বোঝা নয়। তাদের ঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারাও সমাজের জন্য সম্পদে পরিণত হতে পারে। তাই সামাজিকভাবে আমাদের উচিত অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ভালোবাসা এবং তাদের সাথে ভালো আচরণ করা। কারণ বেশিরভাগ অটিস্টিক শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। একজন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু অথবা বিশেষ শিশুর ভাবনার জগৎ কিংবা আচরণ অন্য শিশুদের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও ওদেরও অধিকার রয়েছে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন পাওয়ার। তাই তাদের জন্য সহানুভূতির পাশাপাশি দরকার সহযোগিতার। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা সাধারণত অপরের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না। তারা অতিরিক্ত জেদী হয়ে থাকে এবং নিজেকে বিচ্ছিন্ন ও গুটিয়ে রাখার মানসিকতাসম্পন্ন হয়ে থাকে।
গবেষণার তথ্যে জানা গেছে, প্রতি ১০ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে একজনের ছবি আঁকা, গান, গণিত বা কম্পিউটারে দক্ষতা থাকে। অটিস্টিক শিশুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করতে পারলে তারাও মেধার স্ফুরণে সমাজকে আলোকিত করতে পারবে।
‘অটিজম ইন রিয়েল লাইফ’ বইয়ের লেখক কিম্বারলি গ্রস রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা, চিকিৎসা, ইন্স্যুরেন্স ও তাদের উত্ত্যক্তকারীদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
লেখক ও সাংবাদিক কিথ স্টুয়ার্ট দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রবন্ধ ‘হাও টু হেল্প পিপল উইথ অটিজম? জাস্ট বি নাইস’ এ বলেছেন, ‘যখন আপনার একটি অটিস্টিক শিশু থাকে আপনি মানুষের অসহযোগিতায় অভ্যস্ত হয়ে যান, কিন্তু মানুষেরা যদি দয়ালু ও সহনশীল হতে শিখত তবে তা সবার জন্যই ভালো হতো।’
সুইড বাংলাদেশের ভোকেশনাল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাহমুদা খানম কনা জানান, ২০২২ সাল থেকে স্কুলের ১২ জন শিক্ষার্থীকে সুইডের বিভিন্ন বিভাগে কাজে যুক্ত করা হয়। প্রতিদিন তারা যে কাজ করে, তা চলমান থাকলেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে ছেদ পড়লেই ভুলে যায়।
নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট- এর তথ্য মতে, দেশে ৯৮ হাজার ৫০৩ জন অটিস্টিক ব্যক্তি আছে। তবে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি বলে ট্রাস্ট থেকে জানানো হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, গড়ে প্রতি ১২৫ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিজমের উপসর্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।
নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (এনডিডি ট্রাস্ট) আইনের বিধিমালায় বলা আছে, বাংলাদেশে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী আবাসন তৈরি করতে হবে। প্রতিবন্ধকতার ধরন, বয়স- লিঙ্গ অনুযায়ী সুপরিসর কক্ষের ব্যবস্থা, সবার জন্য আলাদা বিছানার ব্যবস্থা, সহজে ব্যবহার করা যায় এমন বৈদ্যুতিক সুইচ, সেলফ, লকারের ব্যবস্থা, প্রতি দুইজন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির জন্য একজন কেয়ারগিভার নিয়োগসহ নানান বিষয়।
এনডিডি ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক আবু তৈয়ব খান জানান, ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি বিভাগে এসব সেবাদান করার জন্য আটটি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। ঢাকায় দুইটিসহ ১৪টি সেন্টারে অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, কাউন্সিলিং, সাইকো সোশ্যাল কাউন্সেলিং, জীবন-যাপন বিষয়ে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে দক্ষতা ও কর্ম সংস্থান বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই।
তরী ফাউন্ডেশন ও স্কুল ফর গিফটেড চিলড্রেনের পরিচালক মারুফা হোসেন মনে করেন, অটিস্টিক ব্যক্তিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাস্তবতা হলো-সবাই সমানভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই একটি সমন্বিত ও মানবিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
এনজিও বি-স্ক্যানের নির্বাহী পরিচালক সালমা মাহবুব বলেন, 'গত সরকারের আমলে অটিজম নিয়ে প্রচার- প্রচারণা বেশি হলেও মৌলিক কাজ কম হয়েছে। এখনো অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্নদের জন্য হাসপাতালে বিশেষ একটি চিকিৎসাব্যবস্থা নেই। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কর্মসংস্থানের সুযোগও তেমন করে হয়নি।
দেশে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরাঞ্চলে মস্তিষ্কের বিকাশজনিত প্রতিবন্ধিতা বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার (এএসডি) আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) চিকিৎসকগণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম’ (ইপনা) এর তথ্যানুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে ১৬-৩০ মাস বয়সী প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে ১৭ জন বা প্রতি হাজারে ১ দশমিক সাতজন এবং শহরে প্রতি ১০ হাজারে ২৫ জন বা প্রতি হাজারে ২ দশমিক পাঁচজন শিশু অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন।
গবেষণাটি আরো বলছে, ছেলেদের মধ্যে আক্রান্তের হার মেয়েদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ ছাড়া মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে এবং উচ্চ অর্থনৈতিক অবস্থানে থাকা পরিবারের মধ্যে এএসডির প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়।
পাশে দাঁড়াতে হবে সবাইকে
বলতে দ্বিধা নেই, পরিবারের বাইরে সমাজেও অটিস্টিক শিশুর গ্রহণযোগ্যতা খুব কম। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশেষ স্কুল অটিস্টিক বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট নয়, তাদের মূল ধারার স্কুলে সুস্থ, স্বাভাবিক বাচ্চাদের সঙ্গে পড়ালেখা ও খেলাধুলার সুযোগ দিলে তাদের দ্রুত উন্নতি হয়। অনেক স্কুলের কর্তৃপক্ষ রাজি হলেও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কোনো কোনো সুস্থ বাচ্চার বাবা-মা স্কুলে অটিস্টিক বাচ্চা নেওয়ায় আপত্তি জানান। তারা মনে করেন, এমন বাচ্চাদের সঙ্গে মিশলে তাদের বাচ্চার ক্ষতি হবে। অথচ এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং অটিস্টিক বাচ্চাদের সঙ্গে সুস্থ বাচ্চা মিশলে অটিস্টিক বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তেমনি সুস্থ বাচ্চারাও নেতৃত্ব, সহমর্মিতা শেখে, হৃদয়বান হয়।