শিরোনাম

ঢাকা, ১২ মে, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ দিন দিন বাড়ছে।
বিশেষ করে উদ্যোক্তা খাতে নারীরা এখন শুধু নিজেদের ভাগ্যই বদলাচ্ছেন না, বদলে দিচ্ছেন পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় অর্থনীতির চিত্রও। রাজধানীকেন্দ্রিক উদ্যোগের বাইরে জেলা পর্যায়েও গড়ে উঠছে অসংখ্য সফল নারী উদ্যোক্তা। সেই তালিকায় অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা টাঙ্গাইল।
একসময় যেখানে নারীর কর্মপরিধি ছিল ঘরকেন্দ্রিক, সেখানে এখন টাঙ্গাইলের নারীরা অনলাইন ব্যবসা, ফ্যাশন, তাঁতশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কসমেটিকস, হস্তশিল্প ও আইটি-ভিত্তিক সেবায় নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইন্টারনেটের প্রসারের পাশাপাশি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা কার্যক্রম নারীদের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। যা দিনকে দিন বেড়েই চলছে।
ঐতিহ্যের সাথে প্রযুক্তির মেলবন্ধন
টাঙ্গাইল জেলার নাম শুনলেই তাঁতশিল্প আর শাড়ির কথা চোখে ভাসে। দেশের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছে। টাঙ্গাইল শাড়ির বয়নশিল্পকে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতির আলোচনাও এ খাতকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই টাঙ্গাইলের বহু নারী উদ্যোক্তা তৈরি করছেন নিজেদের ব্যবসায়িক পরিচয়। আগে যেখানে তাঁতশিল্প মূলত পুরুষনির্ভর ছিল, বর্তমানে নারীরা শুধু শাড়ি বিক্রিই করছেন না, ডিজাইন, বিপণন ও অনলাইন ব্র্যান্ডিংয়েও নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
টাঙ্গাইল শহরের কয়েকটি অনলাইনভিত্তিক শাড়ি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেশের বাইরে পর্যন্ত পণ্য সরবরাহ করছে।
স্থানীয়ভাবে পরিচালিত বিভিন্ন শাড়ির দোকান ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পাইকারি এবং খুচরা বিক্রির মাধ্যমে বড় বাজার তৈরি করেছে।
ফেসবুক লাইভ থেকে সফল ব্যবসা
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টাঙ্গাইলের অনেক নারী উদ্যোক্তার ব্যবসা শুরু হয়েছে খুব অল্প পুঁজি দিয়ে। কেউ ঘরে বসে ফেসবুক লাইভে শাড়ি বিক্রি শুরু করেছেন, কেউ হোমমেড ফুড কিংবা বুটিক পণ্যের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন এলাকায় নারী উদ্যোক্তাদের ছোট ছোট অনলাইন গ্রুপ ও কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, যেখানে তারা ব্যবসার অভিজ্ঞতা, কাস্টমার ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে একে অন্যকে সহায়তা করছেন।
বিশেষ করে করোনাকালের পর অনলাইন ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগে যারা শুধুই গৃহিণী ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতী, দেলদুয়ার, সদর ও মির্জাপুর এলাকায় এমন বহু নারী রয়েছেন, যারা ঘরে বসেই মাসে কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকার পণ্য বিক্রি করছেন।
টাঙ্গাইলের উদ্যোক্তাদের বড় শক্তি—নিজস্ব পণ্য
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নারী উদ্যোক্তাদের সফলতার অন্যতম কারণ হলো স্থানীয় পণ্যের ব্যবহার। টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, নকশিকাঁথা, হাতে তৈরি গহনা, মধু, আচার, মসলাজাত পণ্য ও হোমমেড খাবারের চাহিদা এখন দেশজুড়ে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নারীরা এসব পণ্য সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই এখন নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করছেন। কেউ ‘টাঙ্গাইল হ্যান্ডলুম’, কেউ ‘হ্যারিটেজ শাড়ি’, আবার কেউ নিজ নামেই অনলাইন পেজ পরিচালনা করছেন। ডিজিটাল পেমেন্ট ও কুরিয়ার সেবার সহজলভ্যতা ব্যবসাকে আরও গতিশীল করেছে।
বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া
নারী উদ্যোক্তাদের পথ এখনো পুরোপুরি সহজ নয়। পারিবারিক অনুৎসাহ, মূলধনের অভাব, সামাজিক কুসংস্কার এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা অনেক নারীকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক নারী এখনও ব্যবসাকে ‘নারীর কাজ নয়’ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যেরও মুখোমুখি হচ্ছেন।
তবে টাঙ্গাইলের নারীরা ধীরে ধীরে এসব বাধা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছেন। অনেক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, শুরুর দিকে পরিবারের সমর্থন না পেলেও ব্যবসায় সফলতা পাওয়ার পর এখন পরিবারই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
অনেক নারী উদ্যোক্তা এখন স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থানও তৈরি করছেন। কেউ তাঁতের কারিগর নিয়োগ দিচ্ছেন, কেউ সেলাইয়ের কাজ শেখাচ্ছেন, আবার কেউ প্যাকেজিং ও ডেলিভারি কাজে নারীদের যুক্ত করছেন। ফলে নারী উদ্যোক্তা আন্দোলন এখন শুধু ব্যক্তিগত সফলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ বাড়াচ্ছে সম্ভাবনা
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ডিজিটাল মার্কেটিং, ই-কমার্স ব্যবস্থাপনা, ফটোগ্রাফি, কনটেন্ট তৈরি এবং অনলাইন কাস্টমার সার্ভিস বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী নিজেদের ব্যবসাকে আরও পেশাদারভাবে পরিচালনা করছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সামিরা জুবেরি হিমিকা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করে যোগ দেন ইউএনডিপিতে। পরবর্তী সময়ে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এবং গ্রামীণফোনের একটি প্রজেক্টে কাজ করেছেন। কিন্তু শুরু থেকেই চেয়েছিলেন নিজে কিছু করতে।
আর সেই থেকেই গড়ে তুলেন ‘টিম ইঞ্জিন’। যা ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের কাজের সাথে যুক্ত।
বর্তমানে অনেক নারী উদ্যোক্তা শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ নন, তারা ওয়েবসাইট, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও কাজ করছেন। টাঙ্গাইলের শাড়ি ও হ্যান্ডলুম পণ্যের অনলাইন বাজার সম্প্রসারণে নারী উদ্যোক্তাদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠছেন নারীরা
বাংলাদেশের সফল নারী উদ্যোক্তা তসলিমা মিজি, সামিরা জুবেরি হিমিকা, সাবিলা ইনুন কিংবা আইভি হক রাসেলের মতো ব্যক্তিত্বরা যেমন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছেন, তেমনি টাঙ্গাইলের স্থানীয় নারী উদ্যোক্তারাও এখন জেলার তরুণীদের সামনে রোল মডেল হয়ে উঠছেন।
একসময় চাকরির অপেক্ষায় থাকা অনেক তরুণী এখন নিজেরাই ব্যবসা শুরু করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। এতে একদিকে যেমন আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে নারীদের আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সঠিক প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ সুবিধা এবং বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে টাঙ্গাইল নারী উদ্যোক্তাদের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে তাঁতশিল্প, হ্যান্ডলুম এবং অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ আগামী দিনে আরও বাড়বে।
নারী উদ্যোক্তারা এখন শুধু ব্যবসায়ী নন, তারা সমাজ পরিবর্তনেরও কারিগর। তাদের সাফল্য প্রমাণ করছে সুযোগ পেলে নারীরাও পারে নেতৃত্ব দিতে, পারে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে। টাঙ্গাইলের নারীদের এই এগিয়ে চলা বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।