বাসস
  ০২ মে ২০২৬, ১১:৪২
আপডেট : ০২ মে ২০২৬, ১২:০৩

মানব পাচার রোধে সীমান্তে তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, বিপন্ন শিশুদের পুনর্বাসন চলছে

ছবি : সংগৃহীত

\ বি এম নূর আলম \

ঢাকা, ২ মে, ২০২৬ (বাসস) : মানব পাচার প্রতিরোধে সীমান্তে তল্লাশি বৃদ্ধি, বিশেষ অভিযান এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

পাশাপাশি পাচারকালে উদ্ধার হওয়া এবং পিতৃ-মাতৃহীন পরিত্যক্ত, এক দিন থেকে সাত বছর বয়সি বিপন্ন শিশুদের ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগে স্থাপিত ছোটমণি নিবাসে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বাসস’কে জানান, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২-এর আওতায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, সীমান্ত এলাকায় তল্লাশি বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানব পাচার রোধে পুলিশ কাজ করছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন বয়সি যুবক-যুবতীদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করা হয়। মানব পাচার চক্রের নেটওয়ার্ক সীমান্ত পেরিয়ে বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। এতে বিভিন্ন দেশের সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়ভাবে জড়িত।

তারা জানান, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিরা শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাদের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পাচারকারীরা ভুক্তভোগীদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়, ফলে দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ী শারীরিক সমস্যা তৈরি হয়। এছাড়া, খাবার ও চিকিৎসার অভাবে তারা অপুষ্টি ও বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হন। বিপজ্জনক ও দাসত্বমূলক কাজে কম বেতনে কাজ করতে বিদেশে পাচারকৃতদের বাধ্য করা হয়। ভুক্তভোগীরা হুমকির কারণে আতঙ্কে থাকেন। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ ও ভয়ভীতির কারণে অনেকে বিষণ্নতায় ভোগে। এছাড়া, পাচার হওয়া নারীরা দেশে ফিরে এসে বৈষম্য ও সামাজিক কলঙ্কের শিকার হন। পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। বিদেশে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আইনি জটিলতায়ও পড়তে হয়। বিদেশে চাকরির আশায় অনেকে পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হন।

পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও আইনি সহায়তা দিতে পুলিশ কাজ করছে।

তিনি বলেন, বিদেশে চাকরির আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে সমুদ্রপথে যাওয়ার চেষ্টা করে বিপদে পড়ছেন। এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন হতে হবে। মানবপাচার রোধে মাছ ধরার নৌকাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কারণ পাচারকারীরা বিদেশগামী বিভিন্ন বয়সি মানুষকে এসব নৌকায় করে নিয়ে জাহাজে তুলে দেয়।

তিনি বলেন, ‘টেকনাফ উপকূল ও সীমান্ত এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি অঞ্চল। এখানে পুলিশের একার পক্ষে মানব পাচার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও সক্ষমতা দিয়ে এ অপরাধ দমনে কাজ করে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় বিদেশে লোভনীয় চাকরির প্রস্তাব দেখিয়ে এসব মানুষদের পাচার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে সীমান্ত দিয়ে পাচার ঠেকাতে টহল, নজরদারি ও অভিযান জোরদার করতে হবে। সীমান্তে সব পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জনবল বাড়ানো প্রয়োজন। সততা ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণেও মানব পাচার বাড়ছে।

মানব পাচার রোধের বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জানান, সন্দেহভাজন স্থানে তল্লাশি, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি, নৌপথ ও বিমানবন্দরে বিশেষ তল্লাশি এবং অভিযান জোরদার করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা, তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, নিরাপত্তা প্রদান এবং পাচারকারীদের কবল থেকে মুক্ত করতে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড জানায়, দেশের উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী এলাকা, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপথে মানবপাচার রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সার্বক্ষণিক টহল, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে মানব পাচার প্রতিরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত প্রচার কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বাসস’কে বলেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ১৫ জন পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। এ সময়ে ২৮৩ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২৬ জন পাচারকারীকে আটক এবং ২৮৪ জন পাচারের শিকার ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালজুড়ে মানব পাচার সংশ্লিষ্ট ৮টি মামলা এবং চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বাসস’কে বলেন, দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে সাগরপথে মানব পাচার করা হচ্ছে। এতে বিভিন্ন চক্র জড়িত। এসব চক্রের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। বাহিনী ও স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মানব পাচার বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন বাসস’কে বলেন, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএমপি’র বিভিন্ন অভিযানে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত ৬৪৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ১৬৮টি মামলা হয়েছে।

এছাড়াও, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আরও ৩৬ জন পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ৩১টি মামলা হয়েছে।

এদিকে পাচারকালে উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় পরিচালিত কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।

রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক জুবলি বেগম রানু বাসস’কে বলেন, পাচারকালে উদ্ধার হওয়া এবং পিতৃ-মাতৃহীন পরিত্যক্ত এক দিন থেকে সাত বছর বয়সি বিপন্ন শিশুদের আজিমপুরসহ ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে স্থাপিত ছোটমণি নিবাসে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।

এছাড়া দেশের প্রতিটি জেলায় স্থাপিত সরকারি শিশু পরিবারে ছয় থেকে ১৮ বছর বয়সি শিশু-কিশোরদেরও পুনর্বাসন করা হচ্ছে। রাজধানীর মিরপুর ও তেজগাঁওয়ে দুটি সরকারি শিশু পরিবার পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে।