শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬(বাসস) : ঢাকার মিরপুুরে একটি গ্যারেজে কাজ করে রহিম। বয়স আনুমানিক ১৬ বছর। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন রং ও রাসায়নিক দ্রব্যের কাজ করতে হয় তাকে। প্রায় তিন বছর ধরে এই গ্যারেজে কাজ করছে সে। প্রথমে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ শিখতে হয়েছে, এখন প্রতিদিন ১৫০ টাকা আর দুপুরে খাবার দেয়। সপ্তাহে একদিন ছুটি। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত কাজ করতে হয়। কষ্ট হলেও রহিম এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে বাধ্য। কেননা রিক্সাচালক বাবার পক্ষে ৫ জন সদস্যের সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই পরিবারের অভাব কিছুটা লাঘবে কাজ করছে সে। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত শেষ করার পর বন্ধ হয়ে যায় তার পড়ালেখা।
শিশু শ্রমের প্রধান কারণ হচ্ছে, দারিদ্র্য এবং সচেতনতার অভাব। দরিদ্র্য পরিবারের পক্ষে ভরণ পোষণ মিটিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ যোগান দেয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চাননা। এ পরিস্থিতিতে বয়সের কথা বিবেচনা না করে যে কোনো পেশায় নিয়োজিত হয়ে আয় রোজগার করলে বাবা-মা একে লাভজনক বলে মনে করেন। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুদের পর্যাপ্ত সরকারি সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক বাবা-মা অসচেতনতার কারণে তার সন্তানকে স্কুলে না পাঠিয়ে অর্থ উপার্জনের আশায় শিশুশ্রমে নিয়োজিত করেন। যা অত্যন্ত অমানবিক, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং শিশুর শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আবার লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ঝরে পড়া শিশুরা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘সেক্টর ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শিশুশ্রম জরিপ-২০২৩ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সরকার ৪৩টি খাতকে শিশুশ্রমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এই ৪৩টি খাতের মধ্যে ৫টি খাতকে চিহ্নিত করে জরিপ করা হয়েছে। খাতগুলো হলো-মাছ, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ (শুটকি উৎপাদন), পাদুকা উৎপাদন, লোহা ও ইস্পাত ঢালাই (ওয়েল্ডিং কাজ বা গ্যাস বার্নার মেকানিকের কাজ), মোটর যানবাহণের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত (অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ) এবং ব্যক্তিগত ও গৃহস্থলি সামগ্রী মেরামত (বিশেষত টেইলারিং ও পোশাকখাত)।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী উল্লিখিত পাঁচটি ঝুঁকিপূর্ণ খাতে ৪০ হাজার ৫২৫টি কারখানায় সব মিলিয়ে ৩৮ হাজার ৮জন শিশু কাজ করে। তাদের প্রায় ৯৮ শতাংশ ছেলে। বাকিরা মেয়ে। সরকার বলছে, দেশে শিশুশ্রম শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে উপবৃত্তির পরিমাণ বাড়ালে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার হার বাড়বে। সেই সাথে শিশুশ্রম নির্মূল করা সম্ভব হবে।
জাতিসংঘ ১৯৫৯ সালে শিশু অধিকার সনদ ঘোষণা করে। বাংলাদেশ এই সনদে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। বাংলাদেশ শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে শিশু হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে, শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো ধরণের বৈষম্য করা যাবেনা। রাষ্ট্রসমূহ শিশুদের পরিচর্যা এবং সরকার শিশুদের সেবা ও সুবিধাদি প্রদান করবে। শিশুদের মৌলিক অধিকার যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে। শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। শিশুদের আর্থিক সুবিধা দিতে হবে।
শিশুদের শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন তারা সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে অন্য দিকে তারা উৎপাদনশীল খাতে নিজেদের নিয়োজিত করতে পারবে।
এক্ষেত্রে বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমেও শিশুদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করা যেতে পারে। এর ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলের পাঁচ থেকে আঠারো বছর বয়সী সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের এবং আঠারো থেকে বাইশ বছর বয়সী যুবকদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বাসা বা কর্মক্ষেত্রে তারা যেন নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার না হয়, ঝুঁকিমুক্ত কাজে নিযুক্ত করা না হয় সেদিকে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা সবাই মিলে যদি আমাদের প্রতিটি শিশুকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারি, তাহলে আমাদের উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন সফল হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমের অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ।