বাসস
  ২৬ মার্চ ২০২৬, ১৯:৩৩

মহান স্বাধীনতা দিবসে চট্টগ্রামে জাতির বীর সন্তানদের স্মরণ 

ছবি: বাসস

চট্টগ্রাম, ২৬ মার্চ ২০২৬ (বাসস) : যথাযোগ্য মর্যাদায় ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস-২০২৬ উদযাপন উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আজ বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) নগরীর পাহাড়তলীর উত্তর কাট্টলীস্থ ডিসি পার্কের দক্ষিণ পাশে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ ও চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে বর্ণাঢ্য কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর কাট্টলীস্থ মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি মো. মনিরুজামান, সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁনসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর/সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ। পরে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে/ ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

দিনটি উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভে ফুলেল শ্রদ্ধায় জাতির বীর সন্তানদের স্মরণ করেছেন সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সর্বস্তরের মানুষ। ভোর থেকেই দলে দলে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। এ সময় অনেককে লাল-সবুজের পোশাক পরে আসতে দেখা গেছে। 
 
এদিকে, স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে সকাল ৮টায় নগরীর জেলা স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীতের সাথে সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, বেলুন-পায়রা উড়িয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও কুচকাওয়াজের সালাম গ্রহণ করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। সিএমপি ও জেলা পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, কারারক্ষী, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, বিএনসিসি, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুব রেড ক্রিসেন্ট ও সরকারি শিশু পরিবার কর্তৃক কুচকাওয়াজে অংশ নেন। 

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের পূর্বপুরুষগণ যে অবর্ণনীয় কষ্ট ও আত্মত্যাগ স্বীকার করে একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়ে গেছেন, তাদের প্রতি আমাদের আজীবন শ্রদ্ধা থাকা উচিত। তোমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করবে এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে নিজেদের দক্ষ করে তুলবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি মো.মনিরুজ্জামান, সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী ও জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমেদ খাঁন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ২৬ মার্চ বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় সার্কিট হাউজ প্রাঙ্গণে জেলা ও মহানগরের প্রায় পাঁচশ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ, টুপি ও উত্তরীয় পরিধান, নগদ অর্থ ও গিফট বক্স দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। 

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বীর মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। 

এদিকে, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে বিকেল সাড়ে ৩টায় জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় প্রীতি ফুটবল ম্যাচ এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য শীর্ষক আলোচনা সভা, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। 

চসিক মেয়র : মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে জাতির বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বৃহস্পতিবার সূর্যোদয়ের পর নগরের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান মেয়র।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মেয়র সাংবাদিকদের বলেন, চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানকারী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধে দেশের পক্ষে অবদান রাখা সব বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের দায়িত্ব।

মেয়র বলেন, স্বাধীনতা অর্জন একটি বড় বিষয়, কিন্তু সেই স্বাধীনতা রক্ষা করা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের লক্ষ্য হতে হবে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নানামুখী উদ্যোগের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে স্বনির্ভর করে তোলার কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে। রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি দুর্নীতিমুক্ত ও স্বনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামাল, প্রধান শিক্ষা কর্মকর্তা ড. কিসিঞ্জার চাকমা, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমাম হোসেন রানা প্রমুখ।

মহানগর বিএনপি : মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির উদ্যোগে বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় বিপ্লব উদ্যান স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একটি সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সঞ্চালনা করেন নগর বিএনপির সদস্য সচিব জনাব নাজিমুর রহমান।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ভূমি ও পার্বত্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।

বক্তব্যে ব্যারিস্টার মীর হেলাল বলেন, মহান স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি মুক্তির জন্য লড়াই শুরু করেছিল।

তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণায় জাতি পেয়েছিল সাহস ও প্রেরণা, যা দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথ দেখিয়েছে। 

তিনি বলেন, আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি সেই সকল মা-বোন ও দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগকে। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে দেশে ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারী শক্তির উত্থান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহিতার চর্চাকে দুর্বল করেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

এসময় উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী বেলাল উদ্দিন, হারুন জামান, নিয়াজ মোহাম্মদ খান, শাহ আলম, আর ইউ চৌধুরী শাহীন, শওকত আজম খাজা, ইয়াসিন চৌধুরী লিটন, শিহাব উদ্দিন মুবিন, মঞ্জুরুল আলম, যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশারফ হোসেন দিপ্তী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ প্রমুখ। 

মহানগর জামায়াত : মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে চট্টগ্রাম মহানগরী জামায়াতের প্রতিটি থানাভিত্তিক র‌্যালি ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ডবলমুরিং থানার র‌্যালিটি আগ্রাবাদ বাদামতল জামে মসজিদ থেকে শুরু হয়ে চৌমুহনী গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালি শেষে সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগরীর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র এবং কোটা বিরোধী আন্দোলন থেকে সৃষ্ট ফ্যাসিবাদ বিরোধী চব্বিশের জুলাই বিপ্লব একই সূত্রে গাঁথা। 

ডবলমুরিং থানা আমির ফারুকে আজমের সভাপতিত্বে এতে আরও উপস্থিত ছিলেন ডবলমুরিং থানার অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রনেতা এম এইচ সোহেলসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। 

চুয়েট : চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) নানা অনুষ্ঠানমালার মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচির সূচনা করেন ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মাহমুদ আব্দুল মতিন ভূইয়া। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এরপর ভাইস চ্যান্সেলরের নেতৃত্বে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে একাত্তরের বীর যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পরবর্তীতে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চুয়েট ক্যাম্পাসে শহীদদের কবরেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয় এবং কবর জেয়ারত ও দোয়া করা হয়। 

সিভাসু : যথাযোগ্য মর্যাদায় চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করা হয়েছে। সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার চত্বরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। এরপর শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সিভাসু পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (বহিরাঙ্গন কার্যক্রম) ও উপাচার্য (রুটিন দায়িত্ব) প্রফেসর ড. এ কে এম সাইফুদ্দিন। উপাচার্যের পর সিভাসু অফিসার সমিতি ও কর্মচারী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।