শিরোনাম

নুরুজ্জামান ফকির
খুলনা, ৬ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): খুলনার ডুমুরিয়ার খর্ডুয়া থেকে বারোআড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতি নদীতে বাঁধ দিয়ে নদী খননের ফলে উজানের ২৮ কিলোমিটার দ্রুত পলি জমে ভরাট হচ্ছে। নদীতে ভাটার সময় স্রোত না থাকায় জোয়ারে সাগর থেকে আসা পলিতে ভরাট হচ্ছে। এই নদীর সাথে সম্পর্কিত রয়েছে প্রায় ৫০ লক্ষাধিক মানুষ। এই নদী মারা গেলে সাধারণ জনগণ যেমন পানিবন্দি হয়ে পড়বে তেমনি প্রায় ৭০ শতাংশ কৃষিজীবী মানুষ বিপাকে পড়বে।
এদিকে, বিলডাকাতিয়ার মত শৈলমারী নদীও পলি জমে ভরাট হওয়ার কারণে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম থেকে শুরু করে ৬/৭ মাস পানি বন্দি হয়ে পড়ে লক্ষাধিক পরিবার। এই অঞ্চলের সিংহভাগ কৃষি জমি এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে। সেখানে বোরো চাষা হচ্ছে না। একই অবস্থা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের ভবদহ, মনিরামপুর, কেশবপুর, ডুমুরিয়া, ফুলতলাসহ ডজন খানেক উপজেলার কমপক্ষে ১১৪টি বিল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, তীব্র খরস্রোতা তেলিগাতি নদীতে পায়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছে দু’পারের মানুষ। ডুমুরিয়ার কদমতলা খেয়াঘাট এলাকায় গিয়ে এই দৃশ্য চোখে পড়ে। উজানে জোয়ার-ভাটা বন্ধ করে অপরিকল্পিত নদী খনন করার ফলে ভাটি এলাকার ২৮ কিলোমিটার নদী দ্রুত পলি জমে ভরাট হচ্ছে। এক মাসের ব্যবধানে নদীতে ১০ ফুটের বেশি পলি জমে বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে বিলডাকাতিয়াসহ ১১৪ বিল। নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়বে বৃহৎ অঞ্চলের ৬০ থেকে ৬৫ লাখ মানুষ।
জানা গেছে, সাগর থেকে উঠে আসা শিবসা নদীর একটি জলধারা বয়ারঝাপা হয়ে বারোআড়িয়া চার মুহনির একটি শাখা ডুমুরিয়ার গ্যাংরাইল, তেলিগাতি, হরিহর নদী হয়ে যশোর-খুলনা অঞ্চলের ১০/১২টি উপজেলার মধ্যদিয়ে বিভিন্ন জলাশয়ে প্রবাহিত। কিন্তু তীব্র খরস্রোতা নদীগুলো পলি জমে ভরাট হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার সূত্র বাসস’কে জানিয়েছে, খুলনা-যশোর অঞ্চলের ৬টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব অঞ্চলের দীর্ঘ দিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।
গত বছরের ২৪ অক্টোবর নদী খননকাজের উদ্বোধন করা হয়। জোয়ার-ভাটা বন্ধ করে নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে নদীগুলো খনন করা হচ্ছে।
কদমতলা খেয়া ঘাটের পাটনি বিশ্বজিৎ মণ্ডল জানান, ‘নদীর স্রোত আটকানোর কারণে দ্রুত পলি জমে ভরাট হচ্ছে। এখন জোয়ারে ছাড়া ভাটায় খেয়া চলে না। এসময় লোকজন পায়ে হেঁটে নদী পারাপার হয়।’
ডুমুরিয়ার ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি শাহাজান জমাদ্দার বাসস’কে জানান, ‘খর্ডুয়া ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বাঁধ দেয়াতে বেপরোয়া গতিতে বাঁধের বাইরে পলি জমে নদী ভরাট হচ্ছে। মাস খানেকের মধ্যে ১০ ফুটের বেশি পলি জমেছে। নদী খনন শেষ হওয়ার আগেই ভাটি এলাকার নদী শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার হুমকিতে পড়তে যাচ্ছে যশোর-খুলনার বৃহৎ একটি অংশ।’
মধুগ্রাম বিল কমিটির সভাপতি জিএম আমান উল্লাহ জানান, ‘প্রবাহমান নদীতে বাঁধ দিয়ে স্রোত আটকিয়ে নদী খনন করায় পলি জমছে। ভাসমান স্কেভেটর দিয়ে নদী খনন করলে অন্তত নদী নতুন করে ভরাট হতো না।’
তিনি বলেন, ‘শৈলমারী নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়ার উত্তরাঞ্চলের মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। তেমনি খর্ডুয়ার নদী মারা গেলে গোটা ডুমুরিয়ার মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়বে। তিনি নদী খননের পাশাপাশি উজানের নদী দ্রুত ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সচল রাখার দাবি জানান।’
কেন্দ্রীয় পানি কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল মোতলেব সরদার জানান, ‘প্রবহমান নদীতে বাঁধ দিয়ে নদী খনন করা একটা অযৌক্তিক কাজ। আমরা নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে খননের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। এই নদী সম্পর্কিত ভবদহ অঞ্চলে রয়েছে ২৭টি বিল, কেশবপুর অঞ্চলে ২৬টি বিল ও আপারভদ্রা অববাহিকায় আছে ৩০টি বিল যা জলাবদ্ধতার হুমকিতে পড়েছে। এছাড়া গত কয়েক বছর ধরে জলাবদ্ধ হয়ে আছে বিলডাকাতিয়াসহ শৈলমারী অববাহিকায় আরো ৩১টি বিল। সবমিলে বৃহৎ এই অঞ্চলে ৬০/৬৫ লাখ লোকের বসবাস রয়েছে।’
এই বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খুলনার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যশোর পানি উন্নয়ন সার্কেল) বি,এম, আব্দুল মোমিন জানান, আগামী জুনে ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার নদী খনন প্রকল্পের ডিপিপি মেয়াদ শেষ হচ্ছে। প্রয়োজন হলে প্রকল্পের সময় বৃদ্ধি করা হবে।
তিনি বলেন, যেখানে বাঁধ দেয়া হয়েছে তার ভাটি এলাকায় ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ড্রেজিং করা আছে। তাছাড়া প্রকল্প রিভিউ বা পুনঃবিবেচনা করারও সুযোগ আছে। আমাদের উদ্দেশ্য পানি নিষ্কাশন করা। সুতরাং বর্ষা মৌসুমে উজানে পানির চাপ বৃদ্ধি হলে বাঁধ কেটে দেয়া হবে। এরপর স্রোতের গতি বৃদ্ধি করতে যতদূর প্রয়োজন হয় ততদূর পর্যন্ত ড্রেজিং করা হবে। শোলমারী নদী খনন বিষয়ে তিনি বলেন, বিলডাকাতিয়াসহ উত্তর ডুমুরিয়া এলাকার পানি নিষ্কাশনে প্রায় ৫০ কোটি টাকার খনন প্রকল্প অনুমোদন হয়ে গেছে। দ্রুত টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এই খনন প্রকল্পের মধ্যে ৫টি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ৩৫ কিউসেক পাম্প স্থাপন করা আছে। এর ৩টি স্থাপন হবে রামদিয়া স্লুইজ গেটে এবং ২টি শৈলমারী স্লুইজ গেটে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে শৈলমারী নদী খনন শুরু হবে।