শিরোনাম

নাজিউর রহমান সোহেল
ঢাকা, ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : দেশের অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পথ সুগম করতে ভর্তিতে বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। আর্থিক সংকটে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যাতে অঙ্কুরেই বিনষ্ট না হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রতি বছর মাধ্যমিক থেকে স্নাতক পর্যায়ের সাড়ে ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হবে এ কর্মসূচির অধীনে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট থেকে এই আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এজন্য ২০২০ সালের তৈরিকৃত এ সংক্রান্ত নির্দেশিকা সংশোধন করতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। যা বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক (উপবৃত্তি) প্রফেসর মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন সোহাগ বাসসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি জানান, গত ৮ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে নতুন খসড়া নির্দেশিকা চূড়ান্ত করতে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় প্রস্তাবিত নির্দেশিকা-২০২৫ এর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কিছু সংশোধনীর পর মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদন হলে সংশোধিত নির্দেশিকা জারি করা হবে।
শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তা প্রদানসংক্রান্ত ‘প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কমিটি’র সদস্য সচিব প্রফেসর মোহাম্মদ আনোয়ার আরও বলেন, প্রস্তাবিত এই নির্দেশিকা কার্যকর হলে আগের তুলনায় তিনগুণ বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তার আওতায় আসবে।
এই নির্দেশিকা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিকৃত আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভর্তি সহায়তা প্রদান নির্দেশিকা, ২০২৫’ নামে অভিহিত হবে। যুগোপযোগী এই নির্দেশিকার প্রস্তাবনা তৈরি করেছে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট (পিএমইএটি)।
গত ৮ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় খসড়া নির্দেশিকার কিছু সংশোধনী দিয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের অনুমোদন মিললে খুব দ্রুতই নির্দেশিকাটি জারি করা হবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. রাজিবুল আলম বাসসকে জানান, ৮ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রস্তাবিত নির্দেশিকার কিছু সংশোধনী দিয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে-খুব দ্রুতই তা আদেশ আকারে জারি করা হবে।
সহায়তা ভোগীর আওতা বাড়ছে :
প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় বিদ্যমান ২০২০ সালের নির্দেশিকার তুলনায় উপকারভোগী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং সহায়তার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি উপজেলায় ৫ জন শিক্ষার্থী ৫ হাজার টাকা করে সরকার থেকে সহায়তা পায়। নতুন নির্দেশিকা প্রস্তাবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে ২০ জন করা হয়েছে। জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানের ২ জনের পরিবর্তে প্রতি উপজেলায় ১০ জন শিক্ষার্থীকে ৬ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, স্নাতক পর্যায়ে আগে কোনো নির্দিষ্ট কোটা না থাকলেও এখন দেশব্যাপী সর্বোচ্চ ২ হাজার জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ৮ হাজার টাকা করে ভর্তি সহায়তা দেওয়া হবে।
আর্থিক সংশ্লেষ :
গত ৮ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভার কার্যপত্র অনুযায়ী, বিদ্যমান ২০২০ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী বছরে ৫ হাজার ৬১৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য ৪ কোটি ১১ লক্ষ ৯৭ হাজার টাকার প্রয়োজন হতো। তবে নতুন নির্দেশিকা অনুমোদিত হলে প্রতি বছর ১৭ হাজার ৫১০ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধার আওতায় আসবে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৮৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এই সম্পূর্ণ ব্যয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের নিজস্ব চলতি তহবিল থেকে নির্বাহ করা হবে।
যোগ্যতা ও আবেদনের শর্তাবলি :
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেসব শিক্ষার্থীর অভিভাবকের বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকার কম, তারাই এই সহায়তার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আগে এই আয়ের সীমা ছিল ২ লাখ টাকার কম। এছাড়া, সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের সন্তানদের পরিবর্তে এখন ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকারের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের পূর্ববর্তী পরীক্ষায় ন্যূনতম ৬০ শতাংশ নম্বর বা সমমানের জিপিএ থাকতে হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, এতিম, ভূমিহীন পরিবারের সন্তান এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের এই সহায়তা প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া :
সহায়তা প্রদানের জন্য স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি ‘প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কমিটি’ এবং অন্যটি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের ‘বাছাই কমিটি’।
‘প্রাথমিক যাচাই-বাছাই কমিটি’তে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের পরিচালক হবেন সভাপতি এবং সদস্য সচিব থাকবেন সহকারী পরিচালক (উপবৃত্তি)। অন্যদিকে, উচ্চপর্যায়ের ‘বাছাই কমিটি’র সভাপতি হবেন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সহকারী পরিচালক (উপবৃত্তি) থাকবেন এ সংক্রান্ত কমিটির সদস্য সচিব।
এই কমিটিগুলো আবেদনসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করবে। নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের সহায়তার অর্থ সরাসরি অনলাইন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রদান করা হবে।
ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) রেজওয়ানা আক্তার জাহান বাসসকে বলেন, দেশের দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ঝরে পড়া রোধে ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যুগোপযোগী পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও বেশিসংখ্যক অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষার মূল স্রোতে রাখতেই নতুন নির্দেশিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন নির্দেশিকাটি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট জানিয়েছে, বর্তমানে ট্রাস্টের আওতায় সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির মাধ্যমে ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রায় ৬৪ লাখ শিক্ষার্থী এবং স্নাতক পর্যায়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার শিক্ষার্থী নিয়মিত উপবৃত্তি ও টিউশন ফি সুবিধা পাচ্ছে।