বাসস
  ২০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৮:২৫

জলবায়ু সহিষ্ণু ঘর পেয়ে ভোলার তিনশত ছিন্নমূল পরিবারে সুখের আনন্দ

জলবায়ু সহিষ্ণু ঘর পেয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখছেন ছিন্নমূল পরিবারগুলো । ছবি: বাসস

আল-আমিন শাহরিয়ার

ভোলা, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ (বাসস): জলবায়ু সহিষ্ণু ঘর পেয়ে ভোলার তিনশত ছিন্নমূল পরিবার সুখের আনন্দে ভাসছেন। একটু মাথা গোঁজার জন্য নতুন স্বপ্নের ঠিকানা পাওয়া একটি অসহায় পরিবারের জন্য যেন এক বিশাল সুখের অনুভুতি। নতুন স্বপ্নের ঠিকানা নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখায়। আর সেটা যদি হয় টেকসই আর জলবায়ু সহিষ্ণু ঘর এবং চারিদিকে বিভিন্ন পুষ্টি সমৃদ্ধ সবুজে ঘেরা আদর্শ বাড়ি।

জেলার ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের দীর্ঘদিনের নোনাজলের চোখের পানি মুছতে হাত বাড়িয়েছে ভোলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গ্রামীন জন উন্নয়ন সংস্থা। এ সংগঠনটি দরিদ্র অসহায় পরিবারগুলোকে বিনামূল্যে তৈরি করে দিচ্ছে পাকা ঘড়। এমন তিনশত ছিন্নমূল পরিবার পাকা ঘর পেয়ে আনন্দে এখন আত্মহারা।

‘রেজিলিয়েন্ট হোমস্টেড অ্যান্ড লাইভলিহুড সাপোর্ট টু দ্য ভালনারেবল কোস্টাল পিপল অব বাংলাদেশ (আরএইচএল)’নামক সংস্থার প্রকল্প এটি। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএএসএফ) এর অর্থায়নে এবং গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার বাস্তবায়নে ভোলা সদর ও বোরহানউদ্দিন উপজেলায় প্রকল্পটি জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ বসবাস ও টেকসই জীবিকার পথ তৈরি করছে। 

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সূত্রে জানা যায়, আরএইচএল প্রকল্পের আওতায় ভূমি থেকে প্রায় তিন ফুট উঁচু ভিটির ওপর জলবায়ু-সহনশীল ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। বর্তমানে ২৯৩টি এমন ঘর নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে।

সরেজমিনে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতলি গ্রামের উপকারভোগী ফাতেমা বেগমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আগে সামান্য বৃষ্টি হলেই সন্তানদের নিয়ে অন্যের ঘরে আশ্রয় নিতে হতো। এখন নিজের জলবায়ু-সহনশীল ঘরে নিরাপদে থাকতে পারছি। একই ইউনিয়নের দরিরাম শংকর গ্রামের রহিমা বেগম জানান, বন্যা বা ভারী বৃষ্টির সময় আর আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয় না। ঘর প্রাপ্তির পাশাপাশি সোলার আলো ও রান্নার জন্য জ্বালানি সাশ্রয়ী বন্ধু চুলা পাওয়ায় দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হয়েছে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলার গঙ্গাপুর ইউনিয়নের জয়া গ্রামের প্রতিবন্ধী নাগর আলীর কাছে এই ঘর যেন জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তিনি বলেন, নিজের পক্ষে এমন ঘর তৈরি করা কোনো দিনও সম্ভব হতো না। নতুন ঘরে থাকায় এখন পানি ও ঝড়ের ভয় নেই। পরিবার নিয়ে খুব ভালো আছি।

শুধু ঘর নির্মাণ নয়, প্রকল্পটি পরিবেশ রক্ষা ও আয়ের বিকল্প উৎস তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে। উপকারভোগীদের বাড়ির চারপাশে লবণ-সহনশীল ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এসব জনপদে একদিকে যেমন সবুজায়ন বাড়ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩৬ হাজার ৫০০টি গাছের চারা ও বেড়া দেওয়ার নেট বিতরণ করা হয়েছে। 

স্থানীয় বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরাও পেয়েছে গাছের চারা। শিক্ষকরা বলছেন, এতে শিশুদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি গাছ লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে এমন পরিবারগুলো, যাদের আগে সেই সামর্থ্য ছিল না।

জীবিকার ক্ষেত্রেও বহুমুখী উদ্যোগ নিয়েছে এ প্রকল্পটি। ছাগল ও ভেড়া পালনের জন্য উঁচু মাচার ঘর ও আর্থিক সহায়তা, লবণ-সহনশীল সবজি চাষ, আদা চাষ, কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ এবং প্রাণিসম্পদ সুরক্ষায় ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম উপকূলীয় মানুষের আয় ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন গ্রুপ গঠনের মাধ্যমে মানুষকে সংগঠিত করা হচ্ছে, যাতে তারা নিজেরাই ঝুঁকি চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে পারে। 

ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের অভিযোজন গ্রুপের সদস্যরা জানান, আগে জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এখন নিয়মিত বৈঠক ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা জানছেন কীভাবে দুর্যোগের ক্ষতি কমানো যায় এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন। 

গ্রামীণ জনউন্নয়ন সংস্থার পরিচালক অ্যাডভোকেট বীথি ইসলাম বাসসকে বলেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভোলার উপকূলীয় মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে অন্তত: প্রাথমিকভাবে সুরক্ষা পাবে বলে তারা আশাবাদী। 

ভোলার জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. তোতা মিয়ার সাথে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি মনে করেন, জলবায়ু-সহনশীল ঘর, লবণ-সহনশীল কৃষি ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সরকারের দারিদ্র বিমোচন সংস্থা পল্লীকর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর সহযোগী সংস্থার সহযোগী হয়ে গ্রামীন জনউন্নয়ন সংস্থা ভোলার মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। 

ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.আরিফুজ্জামান বাসসকে বলেন, সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার এ ধরনের উদ্যোগ উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দুর্যোগপ্রবণ ভোলার উপকূলীয় মানুষের এ গল্প শুধু ক্ষতির নয়, এটি টিকে থাকার গল্প, অভিযোজনের গল্প। 

জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও ‘আরএইচএল’ প্রকল্প তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে নিরাপদ বাসস্থান, টেকসই জীবিকা আর ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভরসা—একটি জলবায়ু-সহনশীল আগামীর স্বপ্ন। আগামীর বাংলাদেশ।