বাসস
  ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৭

অর্থনীতিতে অবদানকারী টাঙ্গাইলের বিখ্যাত ‘করটিয়া’ হাট

ছবি: বাসস

মহিউদ্দিন সুমন

টাঙ্গাইল, ১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : জাতীয় অর্থনীতিতে অন্যতম অবদানকারী ও ব্যবসা বাণিজ্যের ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি টাঙ্গাইলের বিখ্যাত ‘করটিয়ার হাট’।

করটিয়া হাট শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র নয়, এটি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। জমিদারি আমল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই হাট অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সেই সঙ্গে এ হাট টাঙ্গাইল জেলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো হাট এই করটিয়া। এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ের হাট এবং টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি বিক্রয়ের প্রধান কেন্দ্র। যেখানে তাঁতশিল্পের ঐতিহ্য সুলভ মূল্যে শাড়ি ও বিভিন্ন পোশাকের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা ঘটে। যা স্থানীয় অর্থনীতি ও দেশীয় বস্ত্রশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতি সপ্তাহে এই হাটে প্রায় ৩০ কোটি টাকা বাণিজ্য হয়ে থাকে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

জেলা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ করটিয়া হাট। তুলনামূলকভাবে কম দাম এবং বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়ির প্রাপ্যতা থাকার কারণে এই স্থানটি ধীরে ধীরে সারাদেশে এবং স্থানীয়দের পাশাপাশি শাড়ি ব্যবসায়ীদের দ্বারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বিভিন্ন ধরনের বিখ্যাত পোশাক প্রস্তুত করে আসছে। টাঙ্গাইলের দক্ষ কারিগররা যখন অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, তখন তাদের পোশাকগুলি দেশের অভ্যন্তরে এবং বিদেশের ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন করটিয়া হাটের বিক্রেতারা।

ইতিহাস বলছে, করটিয়া হাটের ইতিহাস টাঙ্গাইল শাড়ির ইতিহাসের সাথে জড়িত। এ হাটের প্রতিষ্ঠার সময় আনুমানিক ১৮০০ সালের দিকে। করটিয়া হাটের ইতিহাস করটিয়ার জমিদারদের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় মূলত করটিয়া জমিদারদের শাসনামলে, যখন এই অঞ্চলে কৃষি ও তাঁতশিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ও তার পূর্বপুরুষরা এই হাটের গুরুত্ব বুঝতে পেরে এটিকে আরও সু-সংগঠিত করেন।

প্রথমদিকে এটি ছিল স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত শস্য, গবাদিপশু ও তাঁতশিল্পের কাপড় কেনাবেচার একটি ছোট বাজার। পরবর্তীতে করটিয়া জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় হাটটি ধীরে ধীরে বৃহৎ আকার ধারণ করে এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসতে শুরু করে। ১৯শ ও ২০শ শতকে এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।

ব্রিটিশ আমলে করটিয়া হাট ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে ঢাকার ব্যবসায়ীরাও কেনাবেচা করতে আসতেন। জমিদারদের উদ্যোগে হাটে সু-শৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে, যেখানে আলাদা আলাদা জায়গায় শস্য, কাপড়, গবাদিপশু ও অন্যান্য পণ্য বেচাকেনা হতো। পাকিস্তান আমলে এটি আরও প্রসারিত হয় এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এখানে বড় পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করটিয়া হাট টাঙ্গাইল জেলার অন্যতম বৃহৎ বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

বর্তমানে করটিয়া হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি টাঙ্গাইলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। স্থানীয় তাঁতশিল্পের পণ্য যেমন টাঙ্গাইলের শাড়ি, দেশীয় হস্তশিল্প ও কৃষিপণ্য এই হাটে ব্যাপকভাবে বিক্রি হয়। এটি দেশের প্রধান পাইকারি বাজার গুলোর মধ্যে অন্যতম।

টাঙ্গাইল শাড়ির চাহিদা এবং দেশ ও বিদেশ থেকে ক্রেতাদের আগমন দেখে টাঙ্গাইলের বিখ্যাত করটিয়ার জমিদার পরিবার অষ্টাদশ শতাব্দীতে হাটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। পান্নি পরিবারের সদস্য ওয়াজেদ আলী খান পান্নি ওরফে চাঁদ মিয়া করটিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় একটি হাঁট তৈরি করেছিলেন। সেই সময়ে করটিয়া ছিল একটি নদী বন্দর। কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে হাট বসত। শাড়ি ছাড়াও গবাদিপশু, হস্তনির্মিত জিনিসপত্র এবং আরও অনেককিছু বিক্রি হতো। হাঁটটি প্রতিষ্ঠার পরে পাট এবং প্রাণি সম্পদের জন্য এটি বিখ্যাত হয়ে ওঠে। পরে এটি টাঙ্গাইল শাড়ির জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তৎকালীন জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা ছিল নৌপথ। এই হাট ‘মাহমুদগঞ্জ কাপড়ের হাট’ নামেও পরিচিত ছিল।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করটিয়া হাট প্রায় ৪৫ একর জমিতে অবস্থিত। হাজার হাজার ব্যবসায়ী এখানে এসে ব্যবসা করছেন। শাড়ি ছাড়াও হাটটি শাল ও চাদরের জন্যও বিখ্যাত। এ ছাড়া জেলার কারিগরদের দ্বারা তৈরি শাল এখান থেকে ভারত, মায়ানমার সহ শীত প্রধান দেশগুলিতে রপ্তানি করা হয়।

সাধারণত করটিয়া হাট সপ্তাহে দু’দিন বসে, মঙ্গলবার বিকেলে শুরু হয় এবং বৃহস্পতিবার বিকেলে শেষ হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানের পাইকাররা এখান থেকে শাড়ি কিনে এনে দেশের সুপার শপে খুচরা মূল্যে বিক্রি করেন। টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি মুদ্রিত শাড়িও এখানে পাওয়া যায়। এ হাটে বিক্রি করা শাড়ি গুলো টাঙ্গাইলের পাথরাইল, কালিহাতীর বল্লা, রামপুর, এনায়েতপুর, নরসিংদীর বাবুরহাট, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি, ঢাকার ইসলামপুরে পাওয়া যায়। এই হাটটির বিভিন্ন নকশাযুক্ত এবং রঙিন শাড়ি শহরের মেগা শপিং মলেও এখন পাওয়া। প্রবাদ বাক্যে আছে "চমচম, কাঁসারবাসন ও শাড়ি, এই তিনে টাঙ্গাইলে বাড়ি।" শুধু কথিত নয় বাস্তবেও তাই। মোট কথা দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের মিলনমেলা এই করটিয়া হাট।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, করটিয়া হাট সপ্তাহে দুইদিন মঙ্গলবার ও বুধবার বসে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়ে বুধবার বিকেল পর্যন্ত চলে পাইকারি বেচাকেনা। বৃহস্পতিবার চলে খুচরা বেচাকেনা। এদিন খুচরা কাপড়ের সঙ্গে চলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর বেচাকেনা। পাইকারি ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্ধেক দামে শাড়ি কাপড় কেনা যায়। কিন্তু খুচরা বিক্রয়ের সময় শাড়ি কাপড়ের দামটা তখন বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন জেলার তৈরিকৃত প্রিন্টের বিভিন্ন প্রকার শাড়ি, থ্রিপিস পাওয়া যায়। এ ছাড়াও হাটে থান কাপড়, শার্ট, প্যান্ট পিস, পাঞ্জাবির কাপড়, ছাপা কাপড়, গামছা, ওড়না, তোয়ালে ও লুঙ্গির বেচাকেনা চোখে পড়ার মতো। বর্তমান শীত মৌসুমের ছেলে মেয়েদের সকল প্রকার শীতের কাপড় ও কম্বল সুলভ মূল্যে পাইকারি ও খুচরা বিক্রি করা হয় এ হাটে। 

হাট ঘুরে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা পাইকারি দামে কাপড় বিক্রি করছেন। ক্রেতারাও পছন্দ মতো কাপড় কিনছেন। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার ক্রেতা আসেন তাদের পছন্দ মতো কেনাকাটা করছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, মঙ্গলবার ভোর থেকেই হাজারো ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের ঢল নামে এই হাটে। দেশের নানা প্রান্তের তৈরি কাপড় নায্য দামে বিক্রি হয় বলেই এই হাটটির এত সুনাম। বৃহৎ কাপড়ের হাটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা।

ব্যবসায়ীরা আরো জানান, এই হাটে দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা আসেন পাইকারি কাপড় কিনতে।আগের মতো তেমন বেচাকেনা নাই। ১০-১৫ বছর আগে এই হাটে ক্রেতাদের সমাগম আরো বেশি হতো বেচাকেনাও ভালো হতো। সুতার দাম বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের মুজুরি বৃদ্ধিরকারণে অনেক তাঁত শিল্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কাপড়ের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই ঈদ মৌসুম এই হাটের সরগরম বাড়ে। এছাড়া অন্য সময় গুলোতে ক্রেতা বিক্রেতা একটু কম থাকে ।

বিশিষ্ট শাড়ি ব্যবসায়ী সামিউল ইসলাম জানান, টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী করটিয়া হাটটি মূলত টাঙ্গাইল শাড়ি সহ দেশি-বিদেশি শাড়ি ক্রয় বিক্রয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর পাশাপাশি বস্ত্র খাতে সকল পণ্য এ হাটে পাওয়া যায়। সারা দেশের ব্যবসায়ীরা এই হাটে এসে বেচাকেনা করেন। প্রতি সপ্তাহে এই হাটে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যবসা বাণিজ্য হয়। অপরদিকে এই হাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। যার কারণে ক্রেতা বিক্রেতা উভয়ই নিরাপদে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন।

শাড়ির ব্যবসায়ী মিনহাজ মিয়া জানান, আমি ২৫ বছর ধরে এ হাটে টাঙ্গাইল শাড়ি বিক্রি করে আসছি। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও দেশের বাইরে থেকেও পাইকাররা আসে শাড়ি কিনতে। এখানে কাপড়ের দাম তুলনামূলকভাবে কম। এ জন্য মানুষ এ হাটে শাড়িসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র কিনে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এই হাটে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কেনাকাটা করতে আসেন।

দেশীয় থ্রি পিস তৈরির শোরুম ষড়্‌ঋতু এর ম্যানেজার শহিদুল ইসলাম জানান, আমরা দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত করটিয়া হাটে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। আমরা মূলত দেশি থ্রিপিস বিক্রি করে থাকি। এই হাটের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে আমাদের কোন সমস্যা হয় না।

করটিয়া হাট পরিচালনা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. জিন্না মিয়া জানান, প্রায় ২০০ বছর পুরানো টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী এই করটিয়া হাট। এই হাট টি একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই হাটের ঐতিহ্য হলো সারা বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এই হাটে এসে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকেন। এই হাটে গামছা, লুঙ্গি, টাঙ্গাইল তাঁতের শাড়ি, দেশে তৈরি থ্রি পিস, ইন্ডিয়ান শাড়ি, পাকিস্তান ও ইন্ডিয়ান থ্রি পিস, কম্বল, ছেলে-মেয়েদের শীতের কাপড় সহ বস্ত্রখাতে সকল পণ্য এই হাটে পাওয়া যায়। এই হাটে সপ্তাহে ৩০ কোটির টাকার  ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে থাকে। এ হাটের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ভালো। এখানে ছিনতাই ডাকাতির ঘটনার কোন নজির নেই। নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত পাহারাদার রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসীর সার্বিক সহযোগিতায় হাটটি পরিচালিত হয়ে আসছে। হাটের উন্নয়নের জন্য আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি। আমরা হাট পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে হাটটি কে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।