বাসস
  ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৩৪
আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৪২

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ গাড়িচালকদের অদক্ষতা ও পথচারীদের অসচেতনতা: সড়ক মন্ত্রী

আজ রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে সওজ আয়োজিত রোড সেফটি বিষয়ক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ছবি: বাসস

ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস): সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এমপি বলেছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ গাড়িচালকদের অদক্ষতা ও অযোগ্যতা এবং পথচারীদের অসচেতনতা।

আজ সোমবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) আয়োজিত রোড সেফটি বিষয়ক এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সড়ক মন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা, সেমিনার, প্রকল্প ও পরামর্শ চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বিপুল অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ থেকে অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাস্তবে কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, তা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত বিভিন্ন সেমিনার ও কর্মশালা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। এসব আয়োজন থেকে পাওয়া পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে অতীতে সড়ক নিরাপত্তার জন্য নেওয়া প্রকল্পগুলো থেকে কী অর্জন হয়েছে, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘আমরা জানি, সড়ক নিরাপত্তার জন্য কী কী করতে হবে। অনেক আগে থেকেই আমরা বিষয়গুলো জানি। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি। এই ধারার পরিবর্তন করতে হবে।’

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের সভাপতিত্বে কর্মশালায় সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান, দাতা সংস্থা এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ রবিউল আলম বলেন, এডিবি আয়োজিত কর্মশালায় সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা কোথায় বেশি ঘটছে, কেন ঘটছে এবং কী ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে পদ্ধতি, তা অনুসরণ করা প্রয়োজন।

মন্ত্রী বলেন, সড়ক নির্মাণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দুর্ঘটনা ঘটার পর শুধু কারণ খোঁজার পরিবর্তে দুর্ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনায় সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে বড় বড় মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোগত প্রকল্প গ্রহণ করছি, সেগুলো যেন আগের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আরও নিরাপদ হয়, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতের প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সড়ক নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই বিবেচনায় রাখতে হবে।’

তিনি বলেন, সড়ক শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। তাই সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি সেটি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, কোনো সড়ক পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সংস্কারের জন্য প্রকল্প নেওয়ার পরিবর্তে আগেই সড়কের ক্ষয়ক্ষতি শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এতে সরকারি সম্পদ সংরক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়ও কমানো সম্ভব।

সড়ক মন্ত্রী জানান, চারটি বড় সেতুতে আগাম রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারসংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। অনেক সময় সড়ক পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলে বড় ধরনের সংস্কার প্রকল্প নেওয়া হয় না। আবার প্রকল্পের আকার বড় না হলে ঠিকাদারদের আগ্রহও কম থাকে।
মন্ত্রী বলেন, ‘সড়ক পর্যাপ্ত না ভাঙা পর্যন্ত আমরা অনেক সময় প্রকল্প নিচ্ছি না। কিন্তু আগেই যদি সংস্কার করা যায়, তাহলে সম্পদটা সংরক্ষণ করা যায়। এই মানসিকতা ও প্রক্রিয়া আমাদের পরিবর্তন করতে হবে।’

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, শুধু সাধারণ পুলিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সড়ক নিরাপত্তার সব দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সড়ক নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি স্থায়ী পুলিশ ইউনিট থাকা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের এমন একটি দক্ষ ও বিশেষায়িত কাঠামো থাকা দরকার, যেখানে কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক নিরাপত্তা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করবেন। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ দিতে হবে।

‘আজকে যিনি হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে আছেন, কাল তাকে অন্য কোনো প্রশাসনিক দায়িত্বে পাঠিয়ে দিলে তিনি এতদিনে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, সেটি কাজে লাগানোর সুযোগ কোথায়?’—প্রশ্ন রাখেন মন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, একই সমস্যা প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও রয়েছে। একজন প্রকৌশলী দীর্ঘদিন ধরে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তাকে অন্য দপ্তরে বদলি করা হলে সেই বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়।

এ কারণে সড়ক নিরাপত্তার জন্য বিশেষায়িত জনবল তৈরি এবং তাদের নির্দিষ্ট দায়িত্বে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, জেলা পর্যায়েও সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কর্মকর্তা থাকা প্রয়োজন। তারা জেলা পর্যায়ে সড়কের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং জনগণকে সচেতন করবেন।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে অদক্ষ ও অযোগ্য চালকদের চিহ্নিত করে শেখ রবিউল আলম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত অনেক দুর্ঘটনার পেছনে চালকের বেপরোয়া ও স্বেচ্ছাচারীভাবে গাড়ি চালানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।

চালকদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ আর প্রকল্প নিলেই হবে না; প্রকল্পের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে দক্ষ চালক তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, চালকের লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা এবং যানবাহনের ফিটনেস, সবকিছুকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু কাগজপত্র ঠিক থাকলেই সড়ক নিরাপদ হবে না; বাস্তবে চালক ও যানবাহন উভয়কেই নিরাপদ হতে হবে।

পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিষয়ে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন নীতিমালার কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। বাস ও ট্রাকের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা এবং অযোগ্য যানবাহন শনাক্ত করার মতো বিষয়গুলো নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানো, হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং জনগণকে সড়ক ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, মোটরসাইকেলসহ দুই চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে চালক ও যাত্রীদের হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পথচারীসহ সব ধরনের সড়ক ব্যবহারকারীকে নিরাপদ সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘ফিটনেসযুক্ত যানবাহন নিশ্চিত করা, যোগ্য চালক নিশ্চিত করা, গতি নিয়ন্ত্রণ করা, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কমানো, হেলমেট নিশ্চিত করা এবং জনগণকে সচেতন করা, এসব বিষয়ে কার্যকরভাবে কাজ না করলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।’

আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তার জন্য বিশ্বব্যাংকের প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প রয়েছে। এর পাশাপাশি নতুন করে আরও দু’টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার দুটি প্যাকেজে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে।

তিনি বলেন, এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। জনগণের অর্থ ব্যয় করে নেওয়া প্রকল্পগুলো থেকে বাস্তব সুফল নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থায়নের পাশাপাশি প্রযুক্তি, পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা দিয়ে সহযোগিতা করছে। সেই সহযোগিতা থেকে দেশ কতটা শিখতে পারছে এবং মাঠপর্যায়ে কতটা বাস্তবায়ন করতে পারছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

‘হাজার হাজার কোটি টাকা বিশ্বব্যাংক দিচ্ছে। এডিবি প্রযুক্তি দিচ্ছে, স্বল্প সুদে অর্থায়ন করছে। জনগণকে সেই অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। তাহলে জনগণের অর্থ ব্যয় করে আমরা কী অর্জন করছি, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব,’ বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শিখছি, কিন্তু বাস্তবায়ন করতে পারছি কি না, এই প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের করতে হবে।’

তার ভাষায়, দেশে নিয়মিত সেমিনার হচ্ছে, পরামর্শ আসছে, প্রযুক্তি হালনাগাদ হচ্ছে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে অভিজ্ঞতা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ না করা গেলে আয়োজনগুলো শেষ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

তিনি বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জাতিসংঘেও তিনি বাংলাদেশের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন এবং সেখান থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়া পরামর্শ দেশে বাস্তবায়ন করতে না পারলে শুধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও সেমিনারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।