বাসস
  ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪২
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৬

টিভি চ্যানেলে উপেক্ষিত শৈশব: দেশীয় বিনোদনের অভাবে ঝুঁকছে ভিনদেশি সংস্কৃতিতে

প্রতীকী ছবি

ঢাকা, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : দেশে অনুমোদিত টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা এখন অর্ধশত ছুঁইছুঁই। 

এর মধ্যে নিয়মিত সম্প্রচারে আছে প্রায় ৪২টি চ্যানেল। রিমোটের বোতাম চাপলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সংবাদের ঘনঘটা, টকশোর বাগবিতণ্ডা কিংবা বড়দের নাটক-সিনেমা। কিন্তু জাতির ভবিষ্যৎ—শিশুদের জন্য এসব চ্যানেলে কতটুকু জায়গা বরাদ্দ আছে? উত্তরটা বেশ হতাশাজনক। গুটিকয়েক অনুষ্ঠান বাদ দিলে শিশুদের মানসিক বিকাশে দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিশেষ কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা চোখে পড়ে না।

বর্তমানে বড়রা যেমন তথ্য ও বিনোদনের জন্য টেলিভিশন বা ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল, ছোটরাও তার ব্যতিক্রম নয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা বাবা-মায়ের চেয়ে ডিজিটাল মাধ্যমের ওপর বেশি ভরসা করছে। অথচ গণমাধ্যমে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত আধেয় (কনটেন্ট) নেই।

শিশুদের জন্য বিশেষায়িত গেমস, অ্যাপস বা অনুষ্ঠান না থাকায় তারা বড়দের জন্য তৈরি কনটেন্ট দেখে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। ফলে অভিভাবকেরা যখন দেখছেন শিশুরা প্রযুক্তিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, তখন তারা শঙ্কিত হচ্ছেন; কিন্তু শিশুকে সুস্থ বিনোদনের কোনো বিকল্প দিতে পারছেন না।

বেসরকারি চ্যানেল এটিএন বাংলা ২০০৩ সাল থেকে ‘আমরা করবো জয়’ এবং ‘শাপলা শালুক’-এর মতো শিশুতোষ অনুষ্ঠান চালিয়ে আসছে। এমনকি শিশুদের সৃজনশীলতা শেখাতে ‘আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট’ নামে একটি অনুষ্ঠান শুরু হলেও বাজেট স্বল্পতার কারণে তা বন্ধ করে দিতে হয়। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের মতে, শিশুদের অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন বা স্পন্সর পাওয়া যায় না বলে মালিকপক্ষ এসব অনুষ্ঠান নির্মাণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে দীর্ঘ ১৯ বছর পর শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’ ২০২৫ সাল থেকে আবার শুরু হয়েছে। গান, নাচ, অভিনয়, আবৃত্তি ও অন্যান্য শিল্পকলার প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিশু-কিশোর প্রতিভা খুঁজে বের করেছে এই অনুষ্ঠান। এমনকি অসংখ্য শিল্পী ও বিনোদনজগতের ব্যক্তিত্বের ক্যারিয়ার শুরুর মঞ্চে পরিণত হয়েছিল ‘নতুন কুঁড়ি’।

দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এই অনুষ্ঠানটি। দেশের নানা প্রান্ত থেকে তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিল ‘নতুন কুঁড়ি’। বছরের পর বছর এই অনুষ্ঠান দর্শকদের সামনে হাজির করেছে বহু প্রতিভাবান শিল্পী, যারা পরবর্তীতে হয়ে উঠেছেন সবার পরিচিত মুখ।

এদের মধ্যে রয়েছেন অভিনেত্রী তারানা হালিম, রুমানা রশিদ ঈশিতা, তারিন জাহান, মেহের আফরোজ শাওন, নুসরাত ইমরোজ তিশা, জাকিয়া বারী মম, তমালিকা কর্মকার, সাবরিন সাকা মীম ও আজাদ রহমান শাকিল; গায়িকা সামিনা চৌধুরী, হেমন্তী রক্ষিত দাস ও মহবুবা মাহনুর চাঁদনীসহ আরও অনেকে। চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, নাট্যাঙ্গন ও সঙ্গীতজগতে এসব শিল্পীরা দেশের শিল্পাঙ্গনে ছাপ রেখেছেন।

বর্তমানে ‘দুরন্ত’ টিভি একমাত্র চ্যানেল হিসেবে ২৪ ঘণ্টা শিশুদের জন্য কাজ করছে। এছাড়া এনটিভিতে শুক্রবার ‘বিজ্ঞানে আনন্দ’ এবং শনিবার ‘টিফিনের ফাঁকে’ প্রচারিত হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর বন্ধ থাকার পর একুশে টেলিভিশনে ‘মুক্ত খবর’ পুনরায় শুরু হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

এনটিভির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার কাজী মুহাম্মদ মোস্তফা এ বিষয়ে বলেন, ‘টিভি চ্যানেলগুলোতে শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক ও মানসম্মত প্রোগ্রাম বাড়ানো জরুরি। এটি ভাষা, জ্ঞান ও সামাজিক-আবেগিক বিকাশে সহায়তা করে। তবে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম যেন ক্ষতির কারণ না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।’

তিনি স্পন্সর প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শিশুদের বিকশিত হওয়ার পথ খুলে দিন, যাতে তারা দেশের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’

অন্যদিকে, এটিএন বাংলার তনিমা আখতারের কণ্ঠে ফুটে উঠেছে আক্ষেপ ও প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা এখন বিদেশি কার্টুন ও গেমে আসক্ত। এসব গেমের সহিংসতা তাদের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সবাই মুখে বলে ‘শিশুরাই ভবিষ্যৎ’, কিন্তু গণমাধ্যমে তাদের আলাদা গুরুত্ব কই? বড়দের টকশোতে তাদের নিয়ে কথা হলেও অনুষ্ঠান শেষে সবাই তা ভুলে যায়।’

শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা পর্দায় যা দেখে, তা নিজের জীবনেও চর্চা করার চেষ্টা করে। দেশীয় চ্যানেলে ভালো মানের শিশুতোষ অনুষ্ঠান কেবল তাদের বিনোদনই দেবে না, বরং স্বাবলম্বী হতে এবং দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে উদ্বুদ্ধ করবে। বাণিজ্যের দোহাই দিয়ে আগামী প্রজন্মকে শিকড়হীন সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দেওয়া কি কোনোভাবেই যৌক্তিক? এই প্রশ্নটিই এখন সচেতন মহলের।