বাসস
  ৩১ মার্চ ২০২৬, ২০:১২

রাজস্ব বৃদ্ধি, বৈষম্য হ্রাস ও কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্বারোপ এনবিআর চেয়ারম্যানের 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। ফাইল ছবি

ঢাকা, ৩১ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস ও কাঠামোগত সংস্কারে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, রপ্তানি খাতের সীমিত বৈচিত্র্য এবং পুরোনো কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

আজ রাজধানীতে এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সঙ্গে এক প্রাক-বাজেট বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান এসব কথা বলেন।

ভ্যাট সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভ্যাটের বিভিন্ন হার কমিয়ে একটি যৌক্তিক কাঠামোতে আনার চেষ্টা চলছে। তবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট হার কমিয়ে ৭ শতাংশ করার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয়, এতে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।’

তামাক খাতকে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, দেশে তামাকজাত পণ্যের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম। এ খাত থেকে রাজস্ব বাড়াতে মূল্য সমন্বয় ও কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হবে।

তিনি বলেন, জাল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ব্যাপক কর ফাঁকি হচ্ছে। জাল স্ট্যাম্প ও কর ফাঁকি রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে : সিগারেট প্যাকেটে কিউআর কোড, মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা চালু, সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে হুইসেলব্লোয়ার প্রোগ্রাম চালু, জাল পণ্য শনাক্তকারীদের পুরস্কার প্রদান। এছাড়া জব্দ করা জাল সিগারেট জনসম্মুখে ধ্বংস করে সচেতনতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।

চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের রাজস্ব চাহিদা অনেক বেশি এবং সরকারি ঋণও বাড়ছে। তাই রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়েও দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘গত এক দশকে বাজেটের আকার বেড়েছে, তবে সব অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। করদাতারা যেন দেখতে পান, তাদের অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় হচ্ছে-এটি নিশ্চিত করতে হবে।’

অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে আয়করকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য অতিরিক্ত কর আরোপের বিষয় বিবেচনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘যারা বছরে এক কোটি টাকার বেশি আয় করেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত ৫ শতাংশ কর আরোপ করা যেতে পারে। এতে ন্যায়সংগত করব্যবস্থা নিশ্চিত হবে।’

তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে কোনো চাপের মুখে এনবিআর সরাসরি কর অব্যাহতি দেবে না। এ ধরনের সিদ্ধান্ত সংসদের মাধ্যমে নেওয়া হবে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।’

এখনো বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক রাজস্ব পূর্বাভাসের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বাজেট প্রণয়নে নির্ভুল তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে স্বীকার করেন এনবিআর চেয়ারম্যান। 

তিনি বলেন, ম্যাক্রো সূচকের ভিত্তিতে বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয়, এরপর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।

তিনি এ লক্ষ্য অর্জনে সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।

বৈঠকে ইআরএফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য ৩৭ দফা প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবনাগুলো হলো: ১.মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের উপর করের চাপ কমাতে এমএফএস’র মাধ্যমে অতিরিক্ত কর ফেরতের ব্যবস্থা করা এবং যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদের ব্যাংক সুদের উপর কর্তিত কর ফেরত প্রদান, ২. নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা উপকরণে করহার ০.৫ শতাংশে সীমিত রাখা, ৩. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে পৃথক রাজস্ব নীতি প্রণয়ন এবং সহজে বন্ড সুবিধা প্রদান, ৪. বেসরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ড করমুক্ত রাখা, ৫. কর-জিডিপি হার নিয়ে এনবিআর-ইআরএফ যৌথ জরিপ চালু করা, ৬. ব্যক্তি করদাতার সর্বোচ্চ করহার ৩০-৩৫ শতাংশ নির্ধারণ, ৭. ভ্যাটের একক হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ, ৮. বাজারমূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পদ কর আদায়, ৯. প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার করহার কমানো, ১০. এনবিআরের তিনটি বিভাগের জন্য পৃথক হেল্পলাইন চালু, ১১. কাস্টমসের টাইম রিলিজ স্টাডির মতো আয়কর ও ভ্যাটে একই ধরনের স্টাডি পরিচালনা, ১২. বিনিয়োগকারী ও করদাতাদের সহায়তায় এনবিআরের তিন বিভাগে ফোকাল পয়েন্ট নিয়োগ, ১৩. চট্টগ্রাম, বেনাপোল ও মোংলা বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নারীবান্ধব করা, ১৪. জেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক মিডিয়াম ট্যাক্সপেয়ার ইউনিট (এমটিইউ) গঠন, ১৫. করছাড় প্রদানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং রাজস্ব ক্ষতির প্রাক্কলন প্রকাশ, ১৬. মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা, ১৭. এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রেক্ষিতে আমদানি শুল্ক কাঠামো ধীরে ধীরে কমানো, ১৮. অনিবাসীদের সেবার ওপর উৎসে করহার পুনর্বিবেচনা, ১৯. এনবিআরের সব নীতিনির্ধারণে ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস চালু করা, ২০. গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগ আধুনিকায়নে বিনিয়োগ ও দক্ষ জনবল নিয়োগ, ২১. ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ও মুনাফার কর হ্রাস বা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত প্রত্যাহার, ২২. ঋণ অনুমোদনের আগে এনবিআর ডাটাবেজ থেকে ব্যবসায়িক তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক করা, ২৩. এনবিআর ভবনে একটি মিডিয়া সেন্টার স্থাপন, ২৪. ইআরএফ-এনবিআর রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড চালু করা, ২৫. প্রতি প্রান্তিকে ইআরএফ সদস্যদের সঙ্গে এনবিআরের বৈঠক আয়োজন, ২৬. করযোগ্য জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে জাতীয় জরিপ পরিচালনা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ, ২৭. ট্রান্সফার প্রাইসিং আইনের কার্যকারিতা জোরদার করে অর্থ পাচার রোধ, ২৮. পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োেগ উৎসাহে কর্পোরেট করের ব্যবধান কমপক্ষে ৫ শতাংশ রাখা, ২৯. দেশে কোটি টাকার উপর একাউন্ট হোল্ডার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কর পরিশোধ করছে কি-না, তা যাচাই করা, সারাদেশে ৫ তলার বা তার অধিক উচ্চতার সকল ভবন মালিককে বাধ্যতামূলকভাবে কর নেটের আওতায় আনা অর্থাৎ ৫ তলা বাড়ি থাকলেই তার জন্য কর দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, ৩১. মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানিতে প্রায় দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে-ফলে উচ্চমূল্যের জ্বালানি থেকে রাজস্ব আহরণও বাড়ছে। এ অবস্থায় জ্বালানির আমদানি ব্যয় সহনীয় রাখতে বাড়তি রাজস্ব আহরণ ছাড় দেওয়া যেতে পারে, ৩২. দেশে উৎপাদিত অবৈধ সিগারেট থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, অবৈধ সিগারেট উৎপাদকদের করের আওতায় আনা অথবা সেগুলো বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, ৩৩. কর, ভ্যাট ও কাস্টমস সংক্রান্ত কার্যক্রম সহজ করতে বিদ্যমান টিআইএন ও বিআইএন এর স্থলে একটি ইউনিক আইডি চালুর ব্যবস্থা করা, ৩৪. এনবিআরের তিন উইংয়ের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সুবিধার্থে অনলাইনভিত্তিক ইন্ট্রাকানেক্টিভিটি চালু করা, ৩৫. গাড়ি ও বাড়ির মালিক এবং তাদের লেনদেন ট্রেস করার জন্য ব্যাংক, সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, বিআরটিএ, সঞ্চয় অফিস ও বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রিয়েলটাইম তথ্য আদান-প্রদানের জন্য অনলাইনভিত্তিক ইন্টিগ্রেশন চালু করা, ৩৬. শ্রমঘনখাতে বিনিয়োগে কর ছাড় সুবিধা দেওয়া, ৩৭. আমদানি পণ্যের ভ্যালুয়েশনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রানজেকশন ভ্যালু বিবেচনা করা। এজন্য পণ্যের ভ্যালু সংক্রান্ত ডাটা সংরক্ষণকারী স্বীকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানের ডাটায় এক্সেস গ্রহণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। 

বৈঠকে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালাসহ সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।