বাসস
  ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:২৫

গণতন্ত্রের যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা যেন কখনো থেমে না যায় : প্রধান উপদেষ্টা

সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে বিদায়ী ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস । ছবি: প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

ঢাকা, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি-শুরু করেছি মাইনাস থেকে। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে তারপর সংস্কারের পথ ধরেছি। আজ অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিচ্ছে। কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে-তা যেন কখনো থেমে না যায়।’

নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের একদিন আগে আজ সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে তিনি ভাষণ দেন।

ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার সার্বিক দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সবার। আমাদের সকলের দায়িত্ব দেশকে সত্যিকারের গণতন্ত্র হিসেবে পরিস্ফুটিত করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এই দরজা খুলে দিয়েছে। আমরা যদি সেই স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারি, তবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না।’

গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছে, শরীরের অঙ্গ হারিয়ে দুঃসহ জীবনযাপন করছে, যাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, যাদের লাশ এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যারা অল্পের জন্য বেঁচে গেছে-তাদের সকলের আত্মত্যাগকে এ জাতি যেন কোনোদিন ভুলে না যায়। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমরা যেন তাদের ছবি মনে রেখে সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষমতাবানদের কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়, সে শিক্ষাটি যেন দিয়ে যেতে পারি’।

তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাবানদের ক্ষমতা মানুষকে কীরকম মনুষ্যত্বহীন করে তুলতে পারে সেটা জাতির ইতিহাসে ধরে রাখার জন্য আমরা পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান গণভবনকে জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রেখে যাচ্ছি।’

প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন,‘এখানে আপনাদের স্মৃতির বাস্তব নমুনা সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। জাদুঘর যখন জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হবে তখন আপনি যেখানেই থাকুন, দেশে থাকুন, বিদেশে থাকুন- আমি অনুরোধ করব আপনি সপরিবারে একবার এসে কিছুক্ষণ জাদুঘরে কাটিয়ে যাবেন’।

সংস্কার কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল-তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে’।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে’।

বিচার বিভাগ সম্পর্কে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে।’

অর্থনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, অর্থপাচার ছিল লাগামহীন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রিজার্ভের পরিমাণ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার। আমাদের দেশপ্রেমিক প্রবাসী ভাই-বোনদের রেমিট্যান্সের টাকায় এই রিজার্ভ ক্রমেই বাড়ছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও দেশের মর্যাদা-এই তিনটি মূল ভিত্তি আমরা দৃঢ়ভাবে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। নতজানু পররাষ্ট্রনীতি কিংবা অপর দেশের নির্দেশনা ও পরামর্শনির্ভর বাংলাদেশ এখন আর নয়-আজকের বাংলাদেশ নিজের স্বাধীন স্বার্থ রক্ষায় আত্মবিশ্বাসী, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল’।

রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব গ্রহণের পর আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মৃতপ্রায় এই ইস্যুটিকে পুনরায় বিশ্ব মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি।’

উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। গত ১৮ মাসে ক্রমান্বয়ে এ দেশের মানুষের মধ্যে গণতন্ত্র, একটি কল্যাণমূলক শাসনব্যবস্থা, বাক-স্বাধীনতা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারা-সমালোচনা করতে পারা-জবাবদিহিতায় আনতে পারার যে চর্চা শুরু হলো, তা অব্যাহত রাখতে হবে। এই ধারা যেন কোনোরকমেই হাতছাড়া হয়ে না যায়।’

জুলাই সনদ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ, যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে দেশের মানুষ। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে’।

একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।