বাসস
  ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:০০
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৪:৪৩

জিয়াউর রহমান ছিলেন উদার রাজনীতির প্রবক্তা

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ফাইল ছবি

\ মারুফ মল্লিক \

ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের মাধ্যমে উদার রাজনীতির বিকাশ ঘটান। রাজনীতিতে তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সহনশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা। তিনি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক অঙ্গনে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি ন্যায়সঙ্গত ভোটের পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন।

তিনি রাজনীতি শুরু করেন একেবারে তৃণমূল থেকে, গ্রাম থেকেই তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির সূচনা। এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবও ছিল গভীর।

তিনি সামাজিক জীবনে একটি নতুন ধারা সূচনা করেন এবং মধ্য-বাম সামাজিক-গণতান্ত্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। তাঁর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে এই ধারার জোরালো প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

জিয়াউর রহমানের জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শহরের পাশাপাশি গ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর দর্শনে গ্রাম উন্নয়নই ছিল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল ভিত্তি। এটি ছিল জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম দর্শন। ধারণা ছিল- গ্রামের সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হলে অর্থনীতিও এগিয়ে যাবে।

গ্রামীণ জীবনের উন্নয়নে কৃষি সেচ, খাল খনন, শিক্ষা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সারুবীজ ও সেচযন্ত্রের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ ছাড়া প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গ্রামীণ প্রশাসন গড়ে তুলতে দুটি কর্মসূচি নেওয়া হয়- গ্রাম সরকার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। গ্রাম উন্নয়নের লক্ষ্যে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মূল লক্ষ্য ছিল শাসনব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং শাসনকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর গণ্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়া, বিশেষ করে নারী ও যুবসমাজের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা।

স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি ছিল বিশৃঙ্খল ও নাজুক। আওয়ামী লীগ ও বাকশাল সরকারের নীতিব্যবস্থা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য খুব একটা টেকসই ও উপযোগী ছিল না। একটি কেন্দ্রীভূত, কিছুটা সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।

সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। কিন্তু সে সময় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বাস্তবায়নের উপযোগী ছিল না। সমাজতন্ত্র তখন একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপ্লব সংগঠিত হচ্ছিল।

মিসরে জামাল আবদেল নাসের, লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিপ্লবের কথা বলে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। চিলিতে স্বৈরশাসক অগাস্টো পিনোশে সালভাদর আয়েন্দেকে উৎখাত করেন। কদিন আগেই কিউবায় ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার নেতৃত্বে বিপ্লব সম্পন্ন হয়। উপনিবেশবাদের পতনের পর বিপ্লবীরা সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন।

সে সময় সমাজতন্ত্রের বিপ্লবী স্লোগান গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশও এই বিপ্লবী আবহের বাইরে থাকতে পারেনি। কিন্তু তখন বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র গ্রহণ বা বাস্তবায়নের সক্ষমতা ছিল না। সে সময় নীতিনির্ধারকেরা ছিলেন কিছুটা কল্পনাপ্রবণ ও স্বপ্নদর্শী।

আগ-পিছ বিবেচনা না করেই একের পর এক অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়ন শুরু হয়। সব কলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, এটি শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন।

সঞ্চয় পরিকল্পনার কোনো সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত না থাকায় দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিনিয়োগবান্ধব ছিল না। দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কার্যত পাকিস্তান আমলের চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ছিল। জনবান্ধব কোনো নতুন পরিকল্পনা বা নীতি ছিল না।

এদিকে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে। অবকাঠামো সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ছিল এবং দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছিল। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাসঙ্কোচন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। অব্যবস্থাপনা, বেকারত্ব ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার বাড়ছিল।

বাজারে পণ্যের সংকট দেখা দেয়। খাদ্যাভাব সৃষ্টি হয়। লবণের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। খাদ্যপণ্য পাচার, মজুতদারি ও চোরাচালানের কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। এর ফলেই ১৯৭৪ সালে দেশ দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষের কারণ ছিল ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি, পণ্যের প্রকৃত ঘাটতি ছিল না। সরকারি হিসাবে ২৬ হাজার মানুষ দুর্ভিক্ষে মারা যান। আর শুধু রংপুর বিভাগেই মারা যান ৮০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ (অমর্ত্য সেন, ১৯৮৬)।

রাজনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তোলে। দুর্নীতিবাজদের যথাযথ শাস্তি না দেওয়া ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে অর্থনীতি চরম সংকটে পড়ে (পরিকল্পনা কমিশনের প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক নুরুল ইসলাম)।

এই পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও স্থিতিশীল করার জন্য জিয়াউর রহমানের ওপর প্রবল চাপ তৈরি হয়। তার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া অথবা পশ্চিম ইউরোপের আদলে মধ্য-বাম সামাজিক গণতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা।

জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় পথটি বেছে নেন। তিনি রাজনীতিকে উন্মুক্ত করেন। অর্থনীতিকে উদারীকরণ করেন। তবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি তুলে নেননি। তিনি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করেন এবং এতে সফল হন। অল্প সময়েই সাধারণ মানুষ সুফল পেতে শুরু করে। দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে, বাজারে পণ্যের সরবরাহ বাড়ে।

জিয়াউর রহমানের প্রথম উদ্যোগ ছিল পুরো দেশকে এক আইনের আওতায় আনা। তিনি আশা করেছিলেন, সবাই নিয়ম মেনে চলবে এবং দেশের জন্য সর্বোচ্চ শ্রম দেবে।

তাঁর শাসনামলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি বাড়ে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। কৃষি উৎপাদন, বিশেষ করে ধান উৎপাদন বাড়ে। বিভিন্ন মিল ও বস্ত্রকলের সংখ্যা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

তাঁর নীতিতে সম্পদের ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক বণ্টনের ওপর জোর দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা, রপ্তানি বাড়ানো এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করা।

জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে যে বিষয়টি কম আলোচিত, তা হলো পরিবেশবান্ধব উন্নয়ননীতি। তাঁর শাসনামলে বঙ্গীয় বদ্বীপের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে উন্নয়ননীতি গ্রহণ করা হয়।

পরিবেশ ও প্রকৃতির ক্ষতি না করে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে খাল খনন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জিয়াউর রহমানের সময়ে সারা দেশে প্রায় ২৬ হাজার মাইল খাল খনন করা হয়। এসব খালের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবেশের ক্ষতি না করেই এগুলো ছিল পানি ব্যবস্থাপনার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

উজান থেকে আমাদের পানি আসে এবং দক্ষিণে রয়েছে লবণাক্ততা। খালগুলো পানিপ্রবাহের এলাকা বাড়িয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে জলাধার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আজ আমরা ডেল্টা প্ল্যানের কথা বলি। অথচ ১৯৭৭ সালেই জিয়াউর রহমান দেখিয়েছিলেন কীভাবে স্বল্প খরচে সারা দেশে প্রাকৃতিক জলাধার গড়ে তোলা যায়। খাল খননের সরাসরি প্রভাব পড়েছিল কৃষিতে। তাই এটি জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক বনায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।

তিনি দেশের প্রতিটি মহাসড়ক, সড়ক ও ফুটপাথের দুই পাশে ফলদ বৃক্ষ রোপণের প্রস্তাব দেন। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য পুষ্টিকর ফল ভোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

জিয়াউর রহমান শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৃক্ষরোপণের কথা বলেননি। তিনি এর সামাজিক সুফলও বিবেচনা করেছিলেন। মূলত মাটি, পানি, প্রকৃতি ও পরিবেশের যত কম ক্ষতি করে উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁর দর্শনের ভিত্তি।

অর্থনীতির চাকা সচল করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব মধ্য-বাম উদার উন্নয়ননীতি জিয়াউর রহমানকে প্রকৃত অর্থেই মাঠের মানুষের কাছে নিয়ে যায়। আগে নেতারা থাকতেন মঞ্চে ও রাজপথে।

এই প্রথম একজন শাসক মাঠে, খালে ও বিলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশলেন। তাঁরা একসঙ্গে খাল কাটলেন, একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করলেন। এখান থেকেই গড়ে ওঠে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভিত্তি।

{লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক}