শিরোনাম

ঢাকা, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস): ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচনের বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা স্পষ্ট করেছে। তারা বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতি এবং শান্তিপূর্ণ ভোট আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভার্স আইজাবস রাজধানীতে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মিশনের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক বলতে প্রথমেই বোঝায় বাংলাদেশের সব সামাজিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি— যেমন নারী, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোর অংশগ্রহণ।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান পর্যবেক্ষক জানান, অংশগ্রহণমূলক বলতে তারা মূলত বিশ্বাসযোগ্য ভোটার উপস্থিতিকে বোঝাচ্ছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের অংশগ্রহণ ইঙ্গিত করবে বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছেন।
অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গে আইজাবস বলেন, এটি নাগরিকদের অংশগ্রহণের সামগ্রিক সক্ষমতা এবং তাদের ভোট ন্যায্য ও স্বচ্ছভাবে গণনা হওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করে।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্ভাব্য ভয়ভীতি প্রদর্শন নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গে প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, এটি মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি বলেন, সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা দেশের ৬৪টি জেলায় পর্যবেক্ষক পাঠাব এবং তাদের বিশেষভাবে এ বিষয়ে নজর রাখতে বলা হবে।
নির্বাচনের আগে বা পরে সহিংসতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, বিভিন্নভাবে এটি একটি সমস্যা। তবে, আমি এখনো আশা করি এবং প্রত্যাশা করি বাংলাদেশিরা বিষয়টি মোকাবিলা করবে। নির্বাচনের গুরুত্ব তারা বুঝতে পারছে।
তিনি আরো বলেন, সব অংশীজনই সহিংসতামুক্ত বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছেন।
প্রধান পর্যবেক্ষক আরো জানান, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণে মিশনের বিশেষ ইউনিট রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন নিযুক্ত করেছে। লাটভিয়ার ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য আইজাবসের নেতৃত্বে মিশনটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে কার্যক্রম শুরু করে এবং ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষকের আগমনের মাধ্যমে কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। তারা দেশের ৬৪টি প্রশাসনিক জেলায় নিযুক্ত হবেন। ২০০৮ সালের পর এবার প্রথম পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বকে কতটা গুরুত্ব দেয় তা পুনর্ব্যক্ত করছে, যা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি যৌথ প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, মিশনটি নির্বাচন প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নির্বাচন প্রস্তুতি, আইনগত কাঠামো ও এর বাস্তবায়ন, প্রচারণা কার্যক্রম এবং নির্বাচনী বিরোধ নিষ্পত্তি পর্যবেক্ষণ করবে। এছাড়াও নারী, তরুণ প্রজন্ম ও ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য জনগোষ্ঠীসহ সকলের রাজনৈতিক ও নাগরিক অংশগ্রহণের সামগ্রিক পরিসর মূল্যায়ন করা হবে।
ভোটারদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকাও মূল্যায়ন করবে ইইউ ইওএম ।
প্রধান পর্যবেক্ষক বলেন, এই নির্বাচনে আমাদের কারিগরি মূল্যায়ন তিনটি মূলনীতির ওপর পরিচালিত হচ্ছে : স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা এবং হস্তক্ষেপহীনতা। আমরা দীর্ঘমেয়াদি ও দেশব্যাপী পর্যবেক্ষণে একটি শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি প্রয়োগ করব। আমরা প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করব, তবে ফলাফলকে প্রত্যয়ন করব না। এই নির্বাচন কেবল বাংলাদেশের জনগণের।
পূর্ণ সক্ষমতার এই মিশনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশের পাশাপাশি কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ডের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এর মধ্যে বিশ্লেষকদের একটি মূল দল, দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক এবং কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক নির্বাচন ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছভাবে আয়োজন করা জরুরি। আমার আশা, আমাদের কাজ জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে সহায়ক হবে।
ইইউ ইওএম ১৪ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ভোটের দুই দিন পর ঢাকায় একটি প্রাথমিক বিবৃতি প্রকাশ করবে এবং সংবাদ সম্মেলন করবে। প্রায় দুই মাস পর একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে। এতে ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য সুপারিশ থাকবে।
ইইউ ইওএম পর্যবেক্ষকরা একটি কঠোর আচরণবিধির অধীনে এবং মিশনটি ২০০৫ সালে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষণের নীতিমালার ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালিত হয়।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারসহ ঢাকায় অবস্থানরত ইউরোপীয় কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।