শিরোনাম

ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : সারাদেশে যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে, তাতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, যেভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চলছে তা শান্তিপূর্ণ, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও উৎসাহব্যঞ্জক। কেউ কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলছে না, কোনো অভদ্র আচরণও দেখা যাচ্ছে না। এটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন।
আজ শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় নির্বাচন সংক্রান্ত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। সভা শেষে যমুনার সামনে এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
সভায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি, নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে শফিকুল আলম বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ‘আমরা সন্তুষ্ট, আমরা খুবই খুশি’ বলেন, অধ্যাপক ইউনূস।
তবে সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। ‘এখন আমাদের লক্ষ্য হলো-ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা’ বলেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোট গ্রহণের আর মাত্র চার দিন বাকি থাকায় সামনের সপ্তাহটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ভোট হবে নিরাপদ ও উৎসবমুখর।
নারীরা আনন্দের সঙ্গে ভোট দেবেন এবং পরিবারসহ মানুষ ভোট উৎসবে অংশ নেবেন-এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আশা করি, এই নির্বাচন ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
বৈঠকের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বডি-ওর্ন ক্যামেরা মোতায়েন।
তিনি জানান, সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০টি বডি-ওর্ন ক্যামেরার আওতায় থাকবে।
বৈঠকের সময় এসব ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে, তা সরাসরি দেখানো হয়। প্রেস সচিব বলেন, একটি র্যান্ডম পরীক্ষার অংশ হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা পাঁচটি স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরা পরিহিত সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেন। এর মধ্যে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া এবং খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গার মতো প্রত্যন্ত এলাকাও ছিল।
শফিকুল আলম বলেন, এসব স্থান আগে থেকে নির্ধারিত ছিল না, সম্পূর্ণ র্যান্ডমভাবে নির্বাচন করা হয়। প্রদর্শনীতে দেখা গেছে, বডি-ওর্ন ক্যামেরাগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে।
তিনি জানান, বৈঠকে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ’ নিয়েও আলোচনা হয়, যা এখন পুরোপুরি চালু হয়েছে। এই অ্যাপটি কেবল নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করবেন।
কোনো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে যদি বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তাহলে এই অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা বাহিনী, রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন কমিশনের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো যাবে। এতে দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে জানান প্রেস সচিব।
শফিকুল আলম বলেন, এই অ্যাপটি একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর ব্যবস্থা। দুর্গাপূজার সময় প্রায় ৩২ হাজার পূজামণ্ডপ এই অ্যাপের আওতায় আনা হয়েছিল এবং তখন এটি সফলভাবে কাজ করেছে।
তিনি আরও জানান, বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচন প্রস্তুতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রধানেরা নির্বাচনে সদস্য মোতায়েনের সর্বশেষ তথ্য জানান।
এসব তথ্যানুযায়ী, আসন্ন নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখ নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি।
প্রেস সচিব জানান, সশস্ত্র বাহিনীর ১ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ সদস্য ইতোমধ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ২১০ প্লাটুনে ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্যও নির্দিষ্ট এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন।
এ ছাড়া কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫৮৫ সদস্য ১০ জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলা ও ৬৯টি ইউনিয়নে মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে পুলিশের ১ লাখ ৫৭ হাজার সদস্যের মোতায়েন শুরু হবে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সংখ্যক র্যাব সদস্যও নির্বাচনী দায়িত্বে মোতায়েন করা হবে বলে জানান শফিকুল আলম।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিবের বক্তব্যের বরাত দিয়ে শফিকুল আলম বলেন, প্রার্থী মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনের ভোট স্থগিত হওয়ায় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, এসব আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী আছেন ৮০ জন। আর পুরুষ প্রার্থী ১ হাজার ৯৪৬ জন, যাদের মধ্যে দলীয় ১ হাজার ৬৯২ জন এবং স্বতন্ত্র ২৫৪ জন।
শফিকুল আলম বলেন, এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। সারা দেশে ভোট গ্রহণ হবে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রে।
ডাকযোগে ভোট (পোস্টাল ভোটিং) প্রসঙ্গে প্রেস সচিব বলেন, প্রবাসে অবস্থানরত ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০ জন ভোটারের ব্যালট ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি ব্যালট গ্রহণ করেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরে তিনি জানান, প্রবাসী পোস্টাল ভোটারদের মধ্যে ৯৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৬ শতাংশ নারী। এ ছাড়া ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারত বাংলাদেশে চালু করা পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা, এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি, কার্যকারিতা এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানান তিনি।
বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিষয়ে শফিকুল আলম বলেন, এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪০০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং প্রায় ৫০ হাজার দেশীয় পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি প্রায় ১২০ জন বিদেশি সাংবাদিক নির্বাচন কভার করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সদ্য চালু হওয়া হটলাইন নম্বর ৩৩৩-এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ নির্বাচনসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে, সতর্কবার্তা দিতে বা তথ্য জানতে পারবেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের অগ্রগতি সম্পর্কে প্রেস সচিব জানান, ভোটকেন্দ্রগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশে ইতোমধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।