শিরোনাম

গাইবান্ধা, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসল সোনালি আঁশ খ্যাত পাট। এ অর্থকরী ফসল পাটের দাম চলতি মৌসুমের ভরা বাজারে গাইবান্ধায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। আর এতে দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন গাইবান্ধার পাটচাষিরা।
কৃষকদের ভাষ্যনুযায়ী, অন্তত গত ১০ বছরের মধ্যে ভরা মৌসুমে পাটের এমন দাম পাননি তারা। ফলে উৎপাদন খরচ মিটিয়ে এবার লাভের মুখ দেখছেন চাষিরা। দীর্ঘদিনের হতাশা কাটিয়ে আবারও আশার আলো দেখছেন গাইবান্ধার পাটচাষিরা। তবে, আশঙ্কা কাটেনি সিন্ডিকেটের খপ্পরের!
জেলার উল্লেখযোগ্য গাইবান্ধা সদর উপজেলার কামারজানি ও ফুলছড়ি উপজেলার ‘ফুলছড়ি’ হাটে গিয়ে দেখা গেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে পাটের বেচা-কেনা। ভোর-সকাল থেকেই নৌকায় করে পাট বিক্রি করতে আসছেন চরাঞ্চলের চাষিরা। হাট-মাঠের পাশাপাশি নৌকাতেও চলছে ক্রয়-বিক্রয়। এ সময় হাসি-খুশি মুখ দেখা যায় কৃষকদের।
কৃষকরা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেন প্রাণোচ্ছ্বল ভাবেই। হাটে মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে স্বর্বনিম্ন তিন হাজার ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার ১০০ টাকায়। যা গেল অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাটের ভরা মৌসুমের সর্বোচ্চ মূল্য বলে জানান কৃষকরা।
অন্যদিকে, ফুলছড়ি উপজেলার উদাখালি, উড়িয়া, ফজলুপুর ও কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায় পাট শুকানো ও ছেলার কাজ করছেন চাষিরা। কেউ কেউ প্রস্তুত করছেন বিক্রির জন্যও। অনেক কৃষক পাট ও পাটকাঠি শুকাচ্ছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে। এসময় পাট নিয়ে স্বপ্নবোনা কৃষকদের চোখে-মুখে ছিল হাসির ঝিলিক। এবার ভালো লাভ পাওয়ায় উচ্ছসিত কৃষকরা।
পাটচাষিরা জানান, গেল বেশ কয়েক বছর থেকেই পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার হতাশা থাকলেও এ বছর লাভের মুখ দেখছেন তারা। তিন হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ১০০ টাকা পাটের দাম তারা অন্তত ১০ বছরের মধ্যে পাননি। আর এ বছর পাল্টেছে সেই চিত্র।
ফুলছড়ির হাটে পাট বিক্রি করতে আসা ফুলছড়ি ইউনিয়নের বাগবাড়ি এলাকার পাটচাষি আব্দুস সালাম বাসস’কে বলেন, এবার পাটের দামে আমরা খুশি। এমন বাজার থাকলে আগামীতে আমরা আরও বড় পরিসরে পাটের আবাদ করবো।
আরেক কৃষক আবেদ আলী ব্যাপারী বলেন, সব খরচ বাদে এবার লাভ হচ্ছে কৃষকদের। ভরা বাজারে গত ১০ বছর পর এমন দাম পাচ্ছি আমরা। তবে এই দাম কতদিন থাকবে সেটি নিয়ে শঙ্কার কথা জানান তিনি।
জামালপুরের ঘুটাইল বাজার থেকে আসা পাইকারি পাট ক্রেতা খোরশেদ আলম বাসসকে বলেন, সবচেয়ে ভালো মানের পাট ক্রয় করা হচ্ছে ৪ হাজার ৫০ থেকে ১০০ টাকায়, মাঝারি মানের পাট ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার আর তুলনামূলক নিম্নমানের পাট ক্রয় করছি ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। এ বছর পাটের দাম অনেক ভালো।
মৃদু বাড়ছে পাটচাষ, আগের পরিসংখ্যান বহুদূর
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জেলায় পাট চাষাবাদের ৫ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর ১৭০ হেক্টর জমিতে পাটচাষ বৃদ্ধি পেয়ে ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর এবং গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ২৭ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে পাটচাষ হয়েছিল ১৩ হাজার ৮১৭ হেক্টর জমিতে। কিন্তু তার আগের বছরগুলোতে ভয়াবহভাবে কমেছে পাটের আবাদ।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে জেলার সাত উপজেলায় ১৬ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে বিস্ময়করভাবে ১৪০০ হেক্টর কমে গিয়ে তা ১০ হাজার ৫০০ হেক্টরে নামে এবং ২০২৪ সালে আরও ১২১০ হেক্টর কমে জেলায় ১৩ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয় পাট।
অন্যদিকে, চলতি বছরসহ কোনো বছরই চাষাবাদে এবং পাট উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কৃষি বিভাগ। যদিও সার-বীজের সরকারি প্রণোদনা কার্যক্রম সচল রেখেছে সরকার।
চলতি বছর ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে পাট। এর বিপরীতে উৎপাদন ধরা হচ্ছে ৩৪ হাজার ৯৮৭ মে. টন। এছাড়া এ বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৮ হেক্টর জমির ফসল।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বন্যা-খরাসহ নানা দুর্যোগের ঝুঁকি, হারভাঙ্গা খাটুনি আর ধার-দেনা করে পাট চাষ করেন কৃষকরা। আর তাদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন পাটকল মালিক, ফরিয়া-ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটরা। যার কারণে প্রায় বছরই পাট চাষে পুঁজি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষক। ফলে চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়েছেন অনেক স্থানীয় কৃষক। যদিও গেল দুবছর থেকে আবার ধীর গতিতে বাড়ছে পাটের আবাদ।
ফুলছড়ির কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের উত্তর রসূলপুরের কৃষক ফারুক হোসেন বাসসকে বলেন, যখন এ অঞ্চলের শতকরা ৯০ ভাগ কৃষকের ঘরে পাট থাকে না তখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পাট ক্রয় করেন। ফলে লাভবান হয় ফরিয়া-মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। আর ক্ষতিগ্রস্ত হই আমরা কৃষকরা। তবে এ বছর পাল্টেছে সেই চিত্র। এ সময় তিনি বর্তমান বাজার ধরে রাখতে সরকারের প্রতি আবেদন জানান।
খোলাবাড়ির কৃষক জাহাঙ্গীর আলম সরকার বলেন, পাটকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে পাটচাষিদের সকল হিসেব-নিকেশ। তারা ভরা মৌসুমে পাট বিক্রি করে সংসারের ব্যয়, ধার-দেনা পরিশোধসহ সাংসারিক যাবতীয় কাজ করেন। এ বছরের মতো আগামীতে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য পেতে শুরু থেকেই পাট ক্রয়-বিক্রয়ে সরকারের নজরদারির দাবি করেন তিনি।
ফুলছড়ি হাটে পাট বিক্রি করতে আসা আলফাজ আলী বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত বাজারে দাম ভালো পাচ্ছি, কিন্তু এমন ভরা মৌসুমে পাটের এ দাম ছিল না। বাধ্য হয়ে মাত্র ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকায় পাট বিক্রি করতে হয়েছে আমাদের। আর বিক্রির কয়েক সপ্তাহ পরেই দেখা গেছে, সেই পাটই হাটে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে।
ফুলছড়ি হাটের পাট ব্যবসায়ী কাজল বাসসকে বলেন, মহাজনরা ভালো মানের পাট মণপ্রতি ৪ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত কিনছেন। ফলে কৃষক এ বছর লাভবান হচ্ছেন।
জামালপুরের ঘুটাইল বাজার থেকে আসা পাইকারি পাট ক্রেতা খোরশেদ আলম বলেন, সবচেয়ে ভালো মানের পাট ক্রয় করা হচ্ছে ৪ হাজার ৫০ থেকে ১০০ টাকায়, মাঝারি মানের পাট ৩ হাজার ৯০০ থেকে ৪ হাজার আর তুলনামূলক নিম্নমানের পাট ক্রয় করছি ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। এবছর পাটের দাম অনেক ভালো।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) আসাদুজ্জামান বাসস’কে বলেন, গাইবান্ধায় বর্তমানে পাটের বাজার ভালো। অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি পাটের আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেলায় এ বছর দুই হাজার বিঘা জমির জন্য ২ হাজার ১০০জন কৃষকের মাঝে এক কেজি করে বীজ এবং পাঁচ কেজি করে ডিএপি ও পাঁচ কেজি এমওপিসহ মোট ১০ কেজি করে সার বিনা মূল্যে দেওয়া হয়েছে। ভালো উৎপাদন করতে মাঠ পর্যায়ে উপ-সহকারী কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছেন। পাট চাষিরা তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য পেয়ে এ বছর অনেক খুশি। চলতি বছর ১৩ হাজার ৯৮৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ চাষ করা হয়েছে।