বাসস
  ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩:৫৭
আপডেট : ২৮ মার্চ ২০২৬, ১৩:৫৯

পেঁপে চাষে সফল রেম্রাচাই মারমা, তার অনুপ্রেরণায় বদলে গেছে খাগড়াছড়ির দূরছড়ি গ্রাম 

পেঁপে চাষে সফল রেম্রাচাই মারমা। ছবি: বাসস

//জীতেন বড়ুয়া//

খাগড়াছড়ি, ২৮মার্চ, ২০২৬ (বাসস): জেলায় পেঁপে চাষ করে কৃষিতে সফল হয়েছেন মাত্র ২২ বছরের যুবক রেম্রাচাই মারমা।তার অনুপ্রেরণায় বদলে গেছে খাগড়াছড়ির মানিকছর দূরছড়ি গ্রাম। রেম্রাচাই মারমাকে অনুসরণ করে ঐ গ্রামের সবাই এখন পেঁপে চাষী। সেই সঙ্গে দারিদ্রতাকে বিতাড়িত করে এখন স্বাবলম্বি ঐ গ্রামের প্রায় ৫০টি পরিবার। 

জেলার মানিকছড়ি উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে  দুর্গম দূরছড়ি গ্রাম। এ গ্রামে প্রায় ৬০টি পরিবারের বসবাস। আজ থেকে ৫ বছর আগে এ গ্রামের বাসিন্দাদের জীবন ছিল অভাব-অনটনে। কিন্তু রেম্রাচাই মারমার কারণে পুরো গ্রামবাসী এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী।রেম্রাচাই মারমা ২০২১ সালে স্কুলে পড়া অবস্থায় কৃষির প্রতি ঝোঁক ছিল।সে সময় তার ২শ পেঁপে গাছের  বাগান ছিল।রেম্রাচাই মারমা জানান, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর শিক্ষা জীবন বাদ দিয়ে পুরোদমে কৃষিতে নেমে পড়েন। পর্যাক্রমে বর্তমানে তার ১০ একর জমিতে ৩ হাজার পেঁপের গাছ রয়েছে। এ বছর তিনি ২০ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। গাছে আরো প্রায় ৫ লাখ টাকা পেঁপে ঝুলছে। সামনে আরো ৩ হাজার পেঁপে গাছের  চারা রোপনের পরিকল্পনা রয়েছে তার। তিনি জানান, এক সময় তিনি মানিকছড়ি বাজারে গিয়ে পেঁপে বিক্রি করতে। তিনি তার পেঁপে বাগানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট করার পর ঢাকা থেকে যোগাযোগ করা হয়। এর পর তাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।  

এদিকে পেঁপে চাষে শুধু রেম্রাচাই মারমার ভাগ্য পরিবর্তন হয়নি,হয়েছে পুরো দূরছড়ি গ্রামবাসীর। এক সময় ঐ গ্রামের অধিকাংশ পরিবার ছিল জুম চাষী। তাদের পরিবারে ছিল অভাব-অনটন।  পেঁপে চাষ করে পুরো গ্রামবাসী এখন স্বাবলম্বী।প্রতি শুক্রবার গাছ থেকে পেঁপে সংগ্রহ করা হয়। ঢাকার ব্যবসায়ীরা ৬০ টাকা কেজি দরে পেঁপে কিনে নিয়ে যাচ্ছে। কাঙ্খিত দাম পেয়ে খুশি দূরছড়ি গ্রামের পেঁপে চাষীরা। শুধু তাই নয়, এ পেঁপে চাষকে কেন্দ্র করে আরো অন্তত ৫০টি পরিবারের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।

ঢাকার অনেক সুপারশপও এখন মানিকছড়ির দূরছড়ি গ্রামের পেঁপে মিলছে। 

রেম্রাচাই মারমার মত গ্রীণ লেডি হাইব্রিড জাতের পেঁপে চাষ করেছেন একই এলাকার নারী চাষী রাবাই মারমা। ১একর জমিতে ৪০ হাজার টাকা খরচ গুণতে হয়েছে তার।

বসত ঘরের পাশে অনাবাদি জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন তিনি। অনুকুল পরিবেশ আর ভালো দাম পেলে রাবাই মারমাও লক্ষাধিক টাকার পেঁপে বিক্রি করতে পারবেন। প্রতি কেজি পেঁপের বাজার দর এখন ৩০/৪০ টাকা। তবে পাকা পেঁপের দাম বেশি। প্রতি কেজি ৮০-৯০ টাকা। রাবাই মারমার দেখাদেখি নিজ বাড়িতেই অংহলাপ্রু মারমা পেঁপে চাষ করেছেন। হাজার দশেক টাকা খরচ করে তিনিও অর্ধলাখ টাকা লাভবান হবেন বলে জানান। কম জায়গায় স্বল্প খরচে, ভালো দর পাওয়ায় বাণিজ্যিক পেঁপে চাষে ঝুকছেন মানিকছড়ির দূরছড়ি গ্রামের চাষীরা।

বর্তমানে মানিকছড়ি উপজেলার দূরছড়ি গ্রামের ৫০ পরিবারের  ভাগ্য বদলে গেছে দেখে এখন খাগড়াছড়ির অনেক বেকার মানুষও পেঁপে চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা চালাচ্ছে । এর মধ্যে পেঁপে বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন জেলার সদর উপজেলার উপজেলার ভাইবোনছড়া এলাকার বাসিন্দা জয়রাম চাকমা ও কল্পরঞ্জন চাকমা। তারা দু বন্ধু মিলে সাড়ে চার একর পতিত জমিতে পেঁপে চাষ করছেন। জমির আগাছা পরিস্কার করা থেকে শুরু করে পেঁপের চারা লাগানো পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করেছেন। ইতিমধ্যে তারা ৬৫ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। এসব পেঁপে স্থানীয় ভাবে বিক্রি করার পাশাপাশি যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ফেনী ও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়। এদিকে চাষীদের দাবী খাগড়াছড়ি তাদের বাগানটা সবচাইতে বড় পেঁপে বাগান। জেলায় মূলত রেড লেডী, রাজশাহী পেঁপে, দেশী জাত ও কিছু অন্যান্য হাইব্রীড চাষ হয়। তবে অধিকাংশ কৃষকেরা রেডলেডী জাতের পেঁপে বেশী চাষ করেন। এদিকে তাদের বাগান দেখতে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসেন।

মানিকছড়ির দূরছড়ি গ্রামের রেম্রাচাই মারমার পেঁপে বাগান দেখে দেবব্রত চাকমা নামে আরো এক যুবক পেঁপে চাষ করে পেয়েছেন সফলতা। ৩০ শতক জমিতে পেঁপে চাষ করে প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেন। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাছির উদ্দিন চৌধুরী জানান, রেম্রাচাই মারমার সফলতা দেখে দূরছড়ি গ্রামে এখন আর কেউ বেকার নেই। অদম্য ইচ্ছা শক্তি থাকলে রেম্রাচাই মারমা হতে পারে মডেল। ভাগ্য পরিবর্তন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ ছাড়া পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া ফল চাষের উপযোগী হওয়ায় পেঁপে চাষের ভালো ফলন পাচ্ছে কৃষকেরা। কৃষি বিভাগ পাহাড়ের ফল চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহিত করছেন। পেঁপে চাষের জন্য, যদি বেকার যুবকদের পেঁপে চাষে আগ্রহী করা যায়। তাহলে বেকার সমস্যা সমাধানসহ পেঁপে চাষ হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতি উন্নয়নের অন্যতম ফসল। তিনি আরো বলেন, ‘ফল ও সবজি হিসেবে পেঁপে পছন্দ করে সবাই। বাণিজ্যিক আবাদের জন্য এটি অত্যন্ত উপযোগী ফসল। সাধারণত রোপণের ছয় মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। সঠিকভাবে যত্ন নিলে দুই বছর পর্যন্ত একটি পেঁপে বাগান থেকে টানা ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব।’তিনি আরও বলেন, ‘বসতবাড়ির আশপাশে কিংবা ছাদবাগানে একটি অথবা দুটি পেঁপে গাছ রোপণ করলে আমরা সারা বছর ফল ও সবজি খেতে পারি।’

জেলা কৃষি বিভাগের হিসাব মতে এ বছর জেলায় প্রায় ৪ শ ৩৬ হেক্টর জমিতে পেঁপে চাষ হয়েছে। আর উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ মেট্রিকটন। জেলায় প্রায় সাড়ে ৩শ কৃষক পেঁপে চাষ করেন।