শিরোনাম

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান
খুলনা, ৬ মে, ২০২৬ (বাসস) : জেলার ডুমুরিয়ায় এক নারী তার খামারে কোরবানির জন্য ব্যাপক আদর-যত্নে বড় করে তুলছেন বিশাল আকৃতির গরু। ভালোবেসে তিনি গরুটির নাম রেখেছেন ‘রাজা মানিক’। যার ওজন প্রায় ৪০ মণ।
মিনু সাহা নামে ওই নারী গরুটির দাম চেয়েছেন ১৪ লাখ টাকা। যদিও তিনি ১২ লাখ টাকা পেলেই বিক্রি করে দেবেন বলে ইচ্ছে পোষণ করেছেন। ইতোমধ্যে তার গরুটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক দৃষ্টি কেড়েছে।
উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা মিনু সাহা বেশ কয়েক বছর ধরে গবাদি পশু পালনের সঙ্গে জড়িত। তার পাঁচ বছর বয়সী বিশাল আকৃতির প্রায় ৪০ মণ ওজনের গরুটি ইতোমধ্যেই এলাকায় সাড়া ফেলেছে।
এদিকে, আজ বুধবার ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আশরাফুল কবির, পশু চিকিৎসক ডা. আবু সাঈদ সুমন এবং স্থানীয় সাংবাদিকরা তার খামার পরিদর্শন করেন।
মিনু সাহা বাসসকে বলেন, তিনি কোনো ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা হরমোন প্রয়োগ না করে নিরাপদ খাদ্য দিয়ে গরুটি পালন করেছেন।
খামারি মিনু সাহা বলেন, এ বছর কোরবানিতে গরুর চাহিদা অনেক। তবে গো-খাদ্যের দাম বেশি। তারপরও আগের মতো গরুকে মোটাজাতাকরণে খাদ্য দিয়ে থাকেন। দৈনিক একটি গরুর পেছনে ৭শ-৮শ টাকার মতো খাদ্যে খরচ হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে তার খামারে ৪টা দেশি ও অস্ট্রেলিয়ার জাতের গরু রয়েছে। বিগত বছর লোকসান হওয়ায় এবারও ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দুঃচিন্তায় রয়েছেন তিনি।
এদিকে, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ভালো দামের আশায় ঈদের বাজারের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে ডুমুরিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের সব খামারিরা এখন গরু মোটাতাজাকরণে ব্যস্ত। হাটে ভালো দাম পেতে প্রস্তুত করা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের গরু। বিভিন্ন খামারে দেশি, সিন্ধি, পাকিস্তানি ও অস্ট্রেলিয়ান জাতের গরু পালন করা হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার এই সফল খামারি মিনু সাহা’র প্রশংসা করে বাসসকে বলেন, ‘রাজা মানিক’ পালনের মাধ্যমে এই খামারি যে সাফল্য দেখিয়েছেন, তা আমাদের উপজেলার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পে কোনো ধরনের ক্ষতিকর স্টেরয়েড বা রাসায়নিক ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে পশু পালন করা হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো ডুমুরিয়ার শিক্ষিত বেকার যুবকদের এ ধরনের কৃষিভিত্তিক ও প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ এবং সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি।
আশা করি, তার এই সাফল্য দেখে আরও অনেকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে গরু পালনে এগিয়ে আসবেন এবং নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করবেন।
এলাকার বেশ কিছু গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি খামারে ৩-৪ জন লোক নিয়মিত গরু পরিচর্যা করছেন। তবে উপজেলার প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে এর চিত্র একটু আলাদা।
তারা জানায়, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৫৯৮ জন পারিবারিক ও বাণিজ্যিকভাবে খামারে গবাদিপশু পালন করছেন। আর এ থেকে ৫১টি খামারে ৪৫ হাজার ৮৩৬টি গবাদিপশু উৎপাদিত হয়েছে। যা চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত।
অপরদিকে, এবারও উপজেলা প্রশাসন অনুমোদিত ১৪টি ইউনিয়নে স্থায়ী এবং অস্থায়ীভাবে বসছে ৩টি পশুর হাট। তবে হাটগুলোতে বিশেষ তদারকি করবেন ৫ জন ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম।
গরুর খামারি আমির হামজা বলেন, কিছুদিন আগে ৮টি গরু ছিল। কয়েকটি বিক্রির পর বর্তমানে ৫টি গরু রয়েছে তার খামারে। এবার কোরবানিতে ৫০ হাজার টাকা করে প্রতিটি (৩টি গরু) বিক্রি করবেন তিনি।
বিক্রেতা মো. নজরুলসহ অনেকেই বলেন, গো-খাদ্যের দাম বেশি থাকায় গরু লালন-পালনে তাদের খরচ বেশি হয়েছে। তাই গরুর দামও বেশি।
ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. আশরাফুল কবির বাসসকে বলেন, খামারিদের ও কৃষকদের উৎসাহ দিতে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস।
গত বছর বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবার উন্নয়ন সংস্থা (এফডিএ) এর আরএমটিপি প্রকল্প আওতায় দেশীয় পদ্ধতিতে গরু মোটাতাজা করতে ৪৯ জন খামারিকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। এতে করে দিন দিন গরু পালন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, এক সময় অসাধু কিছু ব্যবসায়ী গরু মোটাতাজা করতে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর স্টেরয়েড ও হরমোন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করতো। তবে, ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহার করে পশু মোটাতাজাকরণের প্রবণতা এখন আর নেই বললেই চলে। তারপরও ডুমুরিয়ায় ৫ জন করে ৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম খামারে গিয়ে গরু মোটাতাজাকরণ হচ্ছে কিনা, তা মনিটরি করছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, এবার খুলনা বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা প্রায় ১০.৭৯ লাখ। যার বিপরীতে এ বছর খুলনা বিভাগে প্রায় ১৪ লাখ ৪৭ হাজার পশু প্রস্তুত করা হয়েছে।
খুলনা বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. গোলাম হায়দার বাসসকে বলেন, খুলনার গ্রামীণ অর্থনীতিতে পশু পালন ও মোটাতাজাকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে, যা বেকার যুবক ও নারীদের জন্য স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর উৎপাদকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পশু কেনাবেচার জন্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। কৃষকরাও ক্রেতাদের প্রতি কৃত্রিম বৃদ্ধি সহায়ক বা ক্ষতিকর ইনজেকশন ছাড়া প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পালিত সুস্থ পশু কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।