শিরোনাম

নেত্রকোণা, ১২ আগস্ট, ২০২৬ (বাসস) : বিলুপ্তপ্রায় ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং চর্চা বাড়াতে নেত্রকোণায় ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা’ শীর্ষক দিনব্যাপী এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (আমাই) উদ্যোগে আজ বুধবার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি মিলনায়তনে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
প্রধান অতিথি বলেন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে তাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্বকীয় পরিচয়ের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। তাই গারো সম্প্রদায়সহ নেত্রকোণা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চায় আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি এ বিষয়ে নিয়মিত সেমিনার, কর্মশালা ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ওপর জোর দেন। একইসঙ্গে এসব আয়োজনে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিত্ব, গবেষক ও তরুণ প্রজন্মকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান।
জেলা প্রশাসক প্রাত্যহিক জীবনে নিজ নিজ মাতৃভাষার চর্চা বাড়ানো এবং ভাষাগুলোকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন, প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত পরিচালক আবুল কালাম।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক বাঁধন আরেং এবং তর্পন ঘাগ্রা। প্রবন্ধে জানানো হয়, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্তত ৪০টি ভাষা স্বীকৃত হলেও এর মধ্যে ১৪টি ভাষাই বর্তমানে ‘বিপন্ন’ বা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, ভাষা পরিবারভিত্তিক বিশ্লেষণে এসব ভাষার মধ্যে ১৫টি চীনা-তিব্বতী, ১১টি ইন্দো-ইউরোপীয়, ৯টি অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং ৫টি দ্রাবিড় ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক অঞ্জন কুমার চিছাম, নেত্রকোণার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা এবং দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত। মুক্ত আলোচনা পর্বে স্থানীয় শিক্ষক, প্রভাষক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
আলোচকরা বলেন, মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের কাছে মাতৃদুগ্ধস্বরূপ এবং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও প্রাণের স্পন্দন লুকিয়ে থাকে তার ভাষায়। ভাষা হারিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ে।
তারা আরও বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিপন্ন ভাষা রক্ষায় পার্বত্য চট্টগ্রামের পাশাপাশি সমতলেও নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি শিক্ষাবর্ষে গারো সম্প্রদায়ের শিশুদের ‘আচিক’ ভাষা এবং হাজং সম্প্রদায়ের শিশুদের মাঝে তাদের নিজ ভাষার পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, কেবল সরকারি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; বিলুপ্তপ্রায় ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ধারক-বাহকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।