বাসস
  ১৮ জুলাই ২০২৬, ২১:২৯

পাঁচ মাসে বহুমাত্রিক সাফল্য অর্জন করেছে সরকার : মাহদী আমিন

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরকারের পাঁচ মাসপূর্তি উপলক্ষ্যে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন মাহদী আমিন। ছবি : পিএমও

ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : পাঁচ মাসে সরকার ‘বহুমাত্রিক অভূতপূর্ব সাফল্য’ অর্জন করেছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।

আজ শনিবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এই কথা জানান।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কবরী হলে সরকারের পাঁচ মাসপূর্তি উপলক্ষ্যে এই সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

তিনি বলেন, ‘গত ৫ মাসে জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন, ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা, স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অনবদ্য সফলতা, জনগণের স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং গণমানুষের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব- এই বহুমাত্রিক অর্জনের ৫ টি দিক দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

‘একই সঙ্গে একটি মানবিক, বৈষম্যহীন, নিরাপদ, মেধাভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথকে সুগম করেছে। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার মূলত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাকেও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।’

‘দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার, পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা এবং বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ী ও দুর্নীতিমুক্ত পর্যালোচনা নিশ্চিত করে সরকার সুশাসনের দৃঢ় বার্তা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বন্যা দুর্গতদের পুনর্বাসন, বিপর্যস্ত ও লুণ্ঠিত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের বিনির্মাণ চলমান রয়েছে।’

পাঁচ মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে অর্জিত সাফল্যকে ভিত্তি করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণে জনগণের প্রতি সরকার পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিনি বলেন, ‘পাঁচ মাসে আমরা দেখেছি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে দৃশ্যমান সাফল্য এসেছে। এই সফলতা গুলোকে আমরা মোটা দাগে পাঁচটি বৃহৎ অর্জনে বিভক্ত করতে পারি। সেগুলো হচ্ছে : জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন, ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেনী পেশার মানুষের স্বার্থরক্ষা,স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সফলতা, জনগণের স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ও গণমানুষের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব।

সাফল্যগুলো হচ্ছে :

শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ১৯ দিনে এবং মেহেরপুরের শিশু ধর্ষণ মামলার রায় ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করে দ্রুততম সময়ে বিচার নিশ্চিতের নজির স্থাপন।

নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির পর মাত্র এক মাসে ১০টি রায় ঘোষণা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মোজাফফর হোসেনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক ছিলেন। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে আছেন। এটি গোয়েন্দা সংস্থার একটি অভূতপূর্ব সাফল্য।

বহুল আলোচিত তনু হত্যা মামলার আসামি এবং শরিফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার আসামিকে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে গ্রেফতার এবং দেশে প্রত্যর্পণের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকেও ইন্টারপোলের সহযোগিতায় দুবাইতে গ্রেফতার এবং দেশে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা চলমান।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাস। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধানকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস এবং ফ্যাসিবাদী সেই অপশক্তি আওয়ামী লীগের রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহন।

আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। 

সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রিপেইড মিটারে ধার্যকৃত মাসিক চার্জ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার।

গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবা জোরদার এবং সেই লক্ষ্যে উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ। প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকবে স্বাস্থ্য ইউনিট। যেখানে পাওয়া যাবে প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ সুবিধাসহ জরুরি বিভাগ, ইনডোর ও আউটডোর সেবা এবং সার্বক্ষণিক আধুনিক প্যাথোলজি সুবিধা।

প্রতিটি ইউনিয়নে প্রাথমিক হেলথকেয়ার ইউনিট গঠন এবং ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা হেলথ স্ক্রিনিং কার্যক্রম চালু।

সংসদীয় কার্যক্রমের প্রথম ২৫ কার্যদিবসের মধ্যে অভূতপূর্ব দ্রুততার সাথে জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার সংশ্লিষ্ট ৯৪ টি বিল পাস। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত অধ্যাদেশ গুলোকে আইনে রূপান্তর।

পরিবেশ সুরক্ষায় দেশ জুড়ে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল সামাজিক কর্মসূচি। ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে প্রাথমিকভাবে ২৫০টি সর্বাধুনিক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর ঘোষণা।

ঢাকা শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিক করতে বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে এআই বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু। চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা চালু এবং ঢাকার জানজট নিরসনে চারটি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল মহানগরের বাইরে স্থানান্তর নির্দেশ।

সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ফলে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেয়ে এখন ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। 

বৈদেশিক রেমিটেন্সের পরিমাণ বাড়ছে যা বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ। প্রবাসীদের গভীর আস্থার প্রতিফলন হিসেবে গত মার্চ মাসে রেকর্ড পরিমাণ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স এসেছে। বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানি শুরু হয় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়ে। সেটিকে ধারণ করে প্রবাসী কার্ডকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার।

ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্রীড়াসহ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারসহ ২০২৬-২৭ সালকে নজরুল বর্ষ ঘোষণা, সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যানার-ফেস্টুনে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ২২ লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে প্রাথমিক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট, ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টার্ট-আপ ও আইডিয়া কম্পিটিশন, শিক্ষার্থীদের সকল পর্যায়ের বৃত্তির সংখ্যা ও অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি, বিভিন্ন পদক্ষেপের বিবরণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখপাত্র।

তিনি বলেন, ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতিটি মহড়ায় সুযোগ পেলেই প্রধানমন্ত্রী অংশ নিচ্ছেন, সেনা ক্যাম্পে গিয়ে তিনি সাধারণ খাবার গ্রহণ করছেন এবং বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে কাজ করছেন।’

মাহদী আমিন বলেন, ‘জাঁকজমকপূর্ণ জীবন পরিহার করে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় যে অভিনব, জনকল্যাণমুখী ও সংবেদনশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজ দেশের মানুষের মধ্যে গভীর আস্থা তৈরি করেছে। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ, তা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হোক বা প্রটোকলহীন সাধারণ জীবনযাপন, আজ প্রমাণ করছে তিনি এদেশে প্রতি শ্রেণী পেশা, ধর্ম, বর্ণ, জাতি- গোষ্ঠী সকলের প্রতিনিধি, তিনি জনতার প্রধানমন্ত্রী।’

তিনি বলেন, ‘মানবিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার এই ধারা অব্যাহত রেখে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর এই অনন্য রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব এ দেশের ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

১৫০ দিনের সরকার গণতান্ত্রিক দেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা বলেন, ‘একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৫ মাসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সরকারের পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আস্থা থাকে। তারেক রহমান সবসময় বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।’

‘বিগত ১৫০ দিনে সরকার কেবল সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও এই অবারিত উদ্যম, দেশপ্রেম এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে চাই, ইনশাআল্লাহ।’ এজন্যই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা, শাহাদাৎ হোসেন স্বাধীন, সহকারি প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক ও আশরোফা ইমদাদ, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ শাহরিয়ার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।