বাসস
  ১৬ জুলাই ২০২৬, ১৪:৩০

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস

জুলাইয়ের গ্রাফিতি। ছবি: বাসস

ঢাকা, ১৬ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : আজ ১৬ জুলাই, ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে দিনটি এবারও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।

গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন পৃথক বাণী দিয়েছেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে ১৬ জুলাই একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

এই দিনে আন্দোলনের সূচনাপর্বে সংঘটিত সহিংসতায় কয়েকজন আন্দোলনকারী নিহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগ পরবর্তী সময়ে সারা দেশে আন্দোলনকে আরও বেগবান করে এবং শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমিক ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে সম্পৃক্ত হন।

পরবর্তীকালে আন্দোলন দেশব্যাপী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

সরকারি কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ ভোরে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে। শহীদদের স্মরণে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ আলোচনা সভা, দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ ও কবরস্থানে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়েছে।

বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনারও আয়োজন রয়েছে।

‘জুলাই শহীদ দিবস’ (১৬ জুলাই) উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে বুধবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দিনটি এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ দিন।

তিনি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের অসামান্য অবদান গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি আন্দোলনে আহত সাহসী তরুণ-তরুণী ও যুবপ্রজন্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এদের অনেকে পঙ্গুত্ববরণ করে আজও যন্ত্রণাময় জীবনযাপন করছেন।

একই সঙ্গে তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং জুলাই যোদ্ধা ও গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব দেশপ্রেমিক নাগরিকের ত্যাগ ও অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।

মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্য, দুর্নীতি, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ, নিপীড়ন ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের জনগণের ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

চব্বিশের ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের প্রসারিত হাত ও গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাতবরণ এবং একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন তরুণের আত্মাহুতি আন্দোলনকে নতুন মোড় ও তীব্রতা দেয়।

পরবর্তী সময়ে আন্দোলনরত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আটক, জেল-জুলুম এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সর্বস্তরের জনতার সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থান সূচিত হয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এই গণ-অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর একক আন্দোলন বা অর্জন নয়, এটি ছিল গণতন্ত্রকামী সকল মানুষের সম্মিলিত আকাক্সক্ষা, সাহস ও আত্মত্যাগের ফসল।

জুলাই শহীদদের আত্মদান স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রের শক্তির উৎস ও সর্বময় ক্ষমতার মালিক জনগণ।

জনগণের মৌলিক অধিকার, স্বার্থ, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। জুলাইয়ের চেতনা একটি মানবিক, স্বৈরাচারমুক্ত, সমতাভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা জোগায়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, জুলাইয়ের সেই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলনই ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ফ্যাসিবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, লুণ্ঠন, গুম, খুন, দমন-পীড়ন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ।

তিনি বলেন, সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের শক্তিতেই বাংলাদেশের মানুষ তাদের মর্যাদা, অধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার সুযোগ  পেয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, ঐতিহাসিক সেই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পর আজ আমাদের সরকার শহীদদের পবিত্র আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শহীদদের রক্ত কখনো বৃথা যেতে পারে না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অমর চেতনা আমাদের জন্য কেবল ইতিহাসের গৌরব নয়, এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও প্রেরণা।’

দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শোকর‌্যালি, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্মৃতিচারণ, দোয়া মাহফিল ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়।

বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল পর্যায়েও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে আলোচনা অনুষ্ঠান ও রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে দেশের বিভিন্ন জাদুঘর, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও গণগ্রন্থাগারে বিশেষ প্রদর্শনী ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এসব আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দিবসটিকে ঘিরে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহীদদের স্মরণে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁদের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরছেন।

অনেকে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি, ছবি ও অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করছেন এবং নতুন প্রজন্মকে দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস জানার আহ্বান জানাচ্ছেন।

দেশের বিভিন্ন মসজিদে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া, মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা, গির্জায় প্রার্থনা সভা ও প্যাগোডায় শান্তি কামনায় ধর্মীয় আচার পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চেতনায় সব ধর্মের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে শহীদদের স্মরণ করছেন।

ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস তাই শুধু শোকের নয়, আত্মত্যাগের চেতনা ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার দিন।

শহীদদের স্মৃতি জাতিকে ভবিষ্যতের পথচলায় সাহস ও প্রেরণা জোগাবে, এমন প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে আজ সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদা ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হচ্ছে ঐতিহাসিক জুলাই শহীদ দিবস।