শিরোনাম

দিনাজপুর, ১০ জুলাই, ২০২৬, (বাসস): বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সমাজের মূলধারায় সম্পৃক্ত করে অন্তর্ভুক্তিমূলক কাজে গড়ে তোলার লক্ষ্যে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায়ের (হাবিপ্রবি) একদল তরুণ সফলতা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘সক্ষম’ ইতোমধ্যে জেলার বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে নিয়মিত কাজ করে সর্ব মহলে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে দিনাজপুর হাবিপ্রবি জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. খাদেমুল ইসলাম প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাসসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, সম্প্রতি হাবিপ্রবি'র ভিসি অধ্যাপক ড. এনামুল্যাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায়নরত তরুণ শিক্ষার্থীদের এ ধরনের সামাজিক কাজের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশকে উৎসাহ দিয়ে প্রশংসা করেছেন।
সূত্রটি জানায়, গত ১০ মে দিনাজপুর শহরে অবস্থিত বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে হাবিপ্রবির তরুণ শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘সক্ষম’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে সংগঠনটি শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশ, দক্ষতা উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সংগঠনের সদস্য রাকিবুল ইসলাম জানান, একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে পরিচয়ের পর সামাজিক একটি প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই ৮ জন তরুণ উপলব্ধি করেন যে, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য দীঘমেয়াদে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘সক্ষম’ নামে একটি তরুণ শিক্ষার্থীদের সংগঠন।
বর্তমানে সংগঠনটি দিনাজপুর বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত কাজ করছে।
শিশুদের সঙ্গে গল্প, খেলাধুলা, গান, শিক্ষা-মূলক কার্যক্রম এবং হাতে-কলমে হস্তশিল্প তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তাদের তৈরি ওয়াল ম্যাট, কানের দুল, চুলের ক্লিপসহ বিভিন্ন হস্তশিল্প বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টল এবং ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রদর্শন ও বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাতে শিশুদের দক্ষতার স্বীকৃতি ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।
এ পর্যন্ত সংগঠনটি ১১টি ফিল্ড ভিজিট সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে ৮ জন কো-ফাউন্ডারের ব্যক্তিগত অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি বিশেষায়িত বিদ্যালয় ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা তাদের রয়েছে।
‘সক্ষম’-এর কো-ফাউন্ডার মাহামুদুল হাসান রিফাত বলেন, দিনাজপুর বুদ্ধি-প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে আমি জানতামই না যে প্রতিবন্ধিতা ও অটিজমের এতো বৈচিত্র্য রয়েছে। সেখানে গিয়ে বুঝেছি, তাদের অনুপ্রাণিত করতে নয়, বরং তাদের কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা নেওয়া যায়। আমাদের লক্ষ্য ছিল সচেতনতা তৈরি করা এবং তাদের সমাজের মূলধারায় নিয়ে আসা। দুই মাসের নিবিড় কাজের পর মনে হচ্ছে আমরা সেই লক্ষ্য পূরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছি।
কো-ফাউন্ডার ইয়ামিন ফারিয়া বলেন, সক্ষম-এর পথচলা সহজ ছিল না। অটিজম স্পেকট্রামের শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে ধৈর্য, সময় ও আন্তরিকতা লাগে। তবে আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি, সঠিক সুযোগ পেলে তারাও সমাজে নিজেদের সক্ষমতা দেখাতে পারে।
আরেক কো-ফাউন্ডার আনিকা জাহান অবন্তী বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিবন্ধকতা কখনোই সম্ভাবনার অন্তরায় নয়। সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতা বিকাশে কাজ করছি। আমাদের কাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি স্যারসহ অনেক শিক্ষক আমাদের সংগঠনকে উৎসব দিয়ে কাজ করার জন্য এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন।
দিনাজপুর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল শাহনেওয়াজ বলেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিজেদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে।
তাদের পাশে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
একজন অভিভাবক মো. সাহাদুল ইসলাম বলেন, অনেক বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুই সূক্ষ্ম ও সৃজনশীল কাজে দক্ষ। কিন্তু মানুষ তাদের ওপর আস্থা রাখতে চায় না। ‘সক্ষম’ সেই আস্থার জায়গা তৈরি করছে, যা আমাদের আশাবাদী করে এগিয়ে যেতে উৎসাহ জুগিয়েছে।
সংগঠনের কো-ফাউন্ডার ত্রয়ী সরকার বলেন, ‘সক্ষম’ আমাদের বিশ্বাসের প্রতিফলন, সঠিক সুযোগ পেলে প্রত্যেক মানুষই নিজের প্রতিভা দিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। আমরা চাই, তারা আত্ম নির্ভরশীল হয়ে সমাজে সমান মর্যাদার সঙ্গে নিজেদের পরিচয় গড়ে তুলুক।
বর্তমানে ‘সক্ষম’-এর কো-ফাউন্ডার হিসেবে রয়েছেন মাহামুদুল হাসান রিফাত, ইয়ামিন ফারিয়া, আনিকা জাহান অবন্তী, মেহেদী হাসান সাকিব, সাফওয়াত সাইমা শাহানা, হাবিবুল বাশার, মো. রাহুল চৌধুরী এবং ত্রয়ী সরকার।
সংগঠনটির সদস্যদের বিশ্বাস, সমাজের সকল মানুষের অংশ গ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য একটি মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।