বাসস
  ০৮ জুলাই ২০২৬, ২০:০৪

হস্ত সেলাইয়ের মাধ্যমে সফল উদ্যোক্তা ফরিদপুরের লুবাবা

ছবি : বাসস

আনিচুর রহমান

ফরিদপুর, ৮ জুলাই, ২০২৬ (বাসস) : প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ জয়ের মধ্য দিয়ে সাফল্যর চূড়ায় পৌঁছানো একজন সফল নারী উদ্যোক্তার গল্প কেবল ব্যবসার প্রসার নয়। বরং তা দৃঢ়তা, স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসের এক আনন্য উপখ্যান।

অনেক মানুষই আছেন যারা বিভিন্ন সময় টিভিতে সিরিয়াল দেখতে পছন্দ করেন, আবার কেউ খেলাধুলা করা, রান্নাবান্না ও সেলাাই করা পছন্দ করেন, তবে আমার বিষয়টি ভিন্ন।

আমি ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি ভিন্ন কিছু করতে আগ্রহী ছিলাম। যেমন কাঁথা সেলাই, বেবি নকশি কাঁথা, ছোট বেবিদেরে ড্রেস ইত্যাদি। এবং ছোটবেলা থেকেই নিজে ড্রেস তৈরি করে সেগুলো আশেপাশে ছোট বাচ্চাদের বা প্রতিবেশীদের গিফট দিতাম।

লুবাবা তুল জান্নাতের (৩৪) জন্ম ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা সৈয়দ বাড়িতে। বাবা সৈয়দ মোহাম্মদ আলী সাবেক প্রধান শিক্ষক, বায়তুল মুকাদ্দাম ইনস্টিটিউট ফরিদপুর।

লুবাবা এসএসসি গেরদা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে, এইচএসসি গেরদা বিএম কলেজ থেকে ২০০৮ সালে এবং গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন ঢাকা দারুল এহসান ইউনিভার্সিটি থেকে ২০১৩ সালে। তার বিয়ে হয় ২০০৮ সালে মো. নজরুল ইসলাম (পিটিআই ইন্সপেক্টর ফরিদপুর) সাথে। বর্তমানে তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের মা।

লুবাবা তুল জান্নাতের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, আমার আম্মুকে কাঁথা সেলাই, বেবি নকশি কাঁথা, ছোট বেবিদেরে ড্রেসসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র তৈরি করতে দেখে আমার মধ্যেও এ সব তৈরিতে উৎসাহ সৃষ্টি হয় ছোট বেলা থেকেই। 

আর সেই উৎসাহের ধারাবাহিকতায় নকশি কাঁথা, বেবি ড্রেস, জুট কার্পেটিং, ডিজাইনার ড্রেস ইত্যাদি দিয়ে ‘নিডল ক্রাফট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান খুলেছি। সংসারের পাশাপাশি পাঁচ বছর ধরে এ পেশায় আছি।

তিনি বলেন, একজন মেয়ে হয়ে এ কাজ করতে গিয়ে জীবনে অনেক প্রতিবন্ধকতায় পরতে হয়েছে আমাকে। বিশেষ করে আমি টিচারের মেয়ে এবং টিচারের স্ত্রী হওয়াতে সমাজে অনেকটা বাঁধা ছিল। তারপরেও থেমে থাকিনি আমি। হ্যাঁ আমার এ কাজে যতটা উৎসাহ পেয়েছি, সেটা আমার মায়ের থেকে। আমার প্রতিষ্ঠান ‘নিডল ক্রাফটে’ রয়েছে হাজারো মানুষের রঙিন স্বপ্ন। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকের কর্মের ব্যবস্থা হয়েছে। অনেকেই তার জীবনে রঙিন স্বপ্ন দেখতে পারছে। বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে ১৫ থেকে ২০ জন কর্মচারী রয়েছেন। আমার এ প্রতিষ্ঠানে নকশি কাঁথা, বেবি ড্রেস, জুট কার্পেটিং, ডিজাইনার ড্রেস (মেয়েদের যাবতীয় যত রকমের ড্রেস রয়েছে), গিফট প্যাকেজ ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আমার এ প্রোডাক্টগুলো দেশ এবং দেশের বাহিরে যাচ্ছে। চিটাগং, খুলনা, রাজশাহী, বগুড়া ও ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় যায়। এছাড়া দেশের বাইরে সিডনি ও আমেরিকাতে যায় আমার পণ্য।

লুবাবা বলেন, আপনাদের সকলের দোয়ায় এখন আমি একজন সফল উদ্যোক্তা। আমার সহযোগিতা নিয়ে আরো অনেকেই সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন। 

জানুয়ারি ২০২৫ এর প্রথম শুক্রবার ৪০ জন উদ্যোক্তা নিয়ে ফরিদপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সামনে হলিডে মার্কেটের যাত্রা শুরু করি। এখানে সুঁই সুতা বুটিক, শারমিনস কিচেন, আফিফা ফ্যাশন হাউস, নাবাস ক্রিয়েশানসহ মোট ৪০ টি প্রতিষ্ঠান এই হলিডে মার্কেটে কাজ করছে।

আমি সফলতা অর্জন করায় সব থেকে ভালো লাগে নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য কিছু করতে পেরেছি বা সমাজের জন্য কিছু করতে পারা। একজন উদ্যোক্তা কখনো শিখিয়ে পড়ে হয় না, এটা নিজের থেকে হতে হয়। কেবল তাহলেই সম্ভব সফল উদ্যোক্তা হওয়া।

‘নিডল ক্রাফট’ এর কর্মী লুৎফর রহমান বলেন, আমি এই প্রতিষ্ঠানে একাউন্টেড এবং কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে আছি। সততা এবং দক্ষতায় আপু পারফেক্ট। এখানে কাজ করে আমি স্বাবলম্বী এবং আনন্দিত।

বায়তুল মোকাদ্দম ইনস্টিটিউটের প্রধান শিক্ষক শামসু নাহার জলি বাসস’কে বলেন,লুবাবা  অত্যন্ত ভদ্র মিষ্টিভাষী খুব পরিশ্রমী একজন মেয়ে। বর্তমানে দেশে চাকরির খুব অভাব সেখান থেকে চাকরি ছাড়াও যে অনেক ভালো কিছু করা যায় সেটা লুবাবাকে দেখলে বোঝা যায়। 

ফরিদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাশউদা হোসেন বাসস’কে বলেন, লুবাবা তুল জান্নাত আমাদের এখানে ব্লক, বাটিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে। সুঁই সুতা ও বুটিকসহ সমাজে বিভিন্ন ধরনের কাজ করার জন্য তার ইচ্ছা শক্তি প্রখর। আমাদের আয়োজনে করা মেলাগুলিতে তার যথেষ্ট পারফরমেন্স থাকে। এছাড়া পৌরসভার মাধ্যমে হলিডে মার্কেটের বিষয়ে তাকে যথেষ্ট পরামর্শ দেয়া হয়েছে এবং আমাদের থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আজ তার কারণে অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে আসছে সমাজে ভালো কিছু করার প্রত্যয়ে। এটা আমাদের নারীদের জন্য অনেক গর্বের।। 

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এর উপ-মহাপরিচালক মো. আহসান কবির বাসস’কে বলেন, বিসিকের মেলায় প্রতিবারই লুবাবা তুল জান্নাতের অংশগ্রহণ প্রশংসনীয়। বিসিক মেলায় হলিডে মার্কেটে থেকে অনেক উদ্যোক্তা আমাদের এখানে আসেন তাদের লিডারশিপ দেন লুবাবা। তিনি আসলেই প্রশংসার দাবিদার। 

আমার জানামতে তাকে দেখে উৎসাহিত হয়ে অনেক নারীই এ পেশায় আসতে শুরু করেছেন। বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং দেশের অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।