বাসস
  ২৯ জুন ২০২৬, ১৭:২৪

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৫০০ কোটি টাকার বেশি আম বাণিজ্যের সম্ভাবনা

ছবি : বাসস

 মোহা শরিফুল ইসলাম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ২৯ জুন ২০২৬ (বাসস): আমের রাজ্য খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে জমে উঠেছে আমের বেচাকেনা। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট আমের প্রধান বাজারে ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি চলছে বেচাকেনা। পাইকারেরা আম কিনে ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। 

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাণিজ্যিক লক্ষ্যমাত্রা ২৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশের উত্তর-পশ্চিমের সীমান্তঘেঁষা একটি জেলা। প্রতিবছর এই জেলায় প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এই আম দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। আর এই বিশাল পরিমাণ আম বেচাকেনার প্রাণকেন্দ্র হলো জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিখ্যাত কানসাট বাজার।

ভোরের মিষ্টি আলো যখন একটু একটু করে উঁকি দেয়, তখনই চোখে পড়ে কানসাট হাটের চিরচেনা রূপ। মাইলের পর মাইলজুড়ে কেবল শত শত বাইসাইকেল এবং ভ্যানে ভরা আমের ঝুড়ি আর ক্যারেট। ক্রেতা-বিক্রেতা, কুলি, দিনমজুর আর পরিবহন বিভাগের মানুষের আওয়াজে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চারপাশ মুখরিত থাকে। প্রতি বছরের মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কানসাটসহ জেলার অন্যান্য আম বাজারগুলোও হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় ব্যস্ত এবং জনবহুল রূপ নেয়। এসময় এই বাজারগুলো কেবল বাজারই নয়, যেন বিশাল অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। এই সময় হাটের বাতাসে মিশে থাকে কাঁচা-পাকা আমের সুবাস আর হাজারো মানুষের জীবিকার স্বপ্ন।

আম বাজারে আসা আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি তরুণ অনলাইন উদ্যোক্তাদের উপস্থিতিও থাকে চোখে পড়ার মতো। 

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের আমচাষি মোহা. মনিরুল ইসলাম বাসসকে বলেন, এ বছর আমের উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই বেড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আমের রাজধানী উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও আমের জন্য বিখ্যাত।

তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন জেলায় আম উৎপাদন হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। 

আমচাষি ও সংবাদকর্মী আহসান হাবিব বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে হাজার হাজার মানুষ আম চাষ ও ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হলেও, সংরক্ষণের অভাব ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অভাবে জেলাটিতে এখনো প্রত্যাশিত আম শিল্প গড়ে ওঠেনি। 

তিনি জানান, ব্যাংক ঋণের অপর্যাপ্ততা, বিনিয়োগের অভাব এবং উন্নত প্রযুক্তির ঘাটতির কারণেই বৃহৎ পরিসরে কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি।

স্থানীয়দের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে ঘিরে পরিবহন, প্যাকেজিং, কুরিয়ার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, পর্যটন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু আম শিল্পকে বাঁচাতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা, পর্যটন অবকাঠামো, কৃষকের অধিকার এবং ব্র্যান্ডিং নিশ্চিত করার কোনো পদক্ষেপ নাই। এসব নিশ্চিত করা গেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম শিল্প ভবিষ্যতে দেশের কৃষি, অর্থনীতি ও পর্যটনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. ইয়াছিন আলী জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এ বছর ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর বাগানে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। 

তিনি বলেন, গত বছর জেলায় আমের বাণিজ্যিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু এ বছর আমের উৎপাদন বেশি হওয়ায় ২৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি।

উল্লেখ্য, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের ৪টি প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় অর্ধশত বাজারে ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, কাটিমন, ব্যানানা, বারি-৪ সহ বিভিন্ন প্রজাতির গুটি আম পাওয়া যাচ্ছে।