বাসস
  ১১ জুন ২০২৬, ১৬:৩৭

সাতক্ষীরায় আঙুর চাষে সফল কৃষক হেলাল উদ্দীন

ছবি : বাসস

 মো. আসাদুজ্জামান

সাতক্ষীরা, ১১ জুন ২০২৬ (বাসস): বিদেশি ফল আঙুর চাষ করে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দিন। পেশায় ট্রাক ড্রাইভার ছিলেন হেলাল উদ্দীন (৪৫)। তিনি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা বাইপাস সড়কের বাসিন্দা জিন্নাত মোল্লার পুত্র।

হেলাল উদ্দীন শখের বশে আঙুর চাষ শুরু করলেও তা এখন পরিণত হয়েছে লাভজনক ব্যবসায়। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আঙুর চাষ করাটা অনেকটা অবাস্তব মনে হলেও তিনি তাতে সফল হয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশে আঙুর চাষ করলে তা টক হয় এমন প্রচলিত ধারণাকেও তিনি ভুল প্রমাণ করেছেন। আর তার এই কাজে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী আলেয়া বেগম।

সরজমিনে দেখা যায়, মাচার নিচে সারি সারি ঝুলে আছে থোকা থোকা আঙুর। সবুজ পাতার ফাঁকে কোথাও লাল, কোথাও কালো, কোথাও হলুদ, কোথাও আবার সবুজ রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে পুরো বাগান। দেখতে যেমন : অপরূপ সুন্দর, স্বাদেও তেমনি মিষ্টি। 

হেলাল উদ্দীন জানান, তিন বছর আগে ইউটিউব দেখে শখের বশে বাড়ির আঙিনায় দুটি আঙুরের চারা রোপণ করেছিলেন। প্রথম বারেই সেখানে ভালো ফলন পাওয়ায় আঙুর চাষে তার আগ্রহ বাড়ে। দ্বিতীয় বছরেও ভালো ফলন পান। এরপরই সাতক্ষীরা শহরের বাইপাস এলাকায় ১৫ কাঠা জমিতে গড়ে তুলেছেন এই আঙুর বাগান। বর্তমানে তার বাগানে আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ইউক্রেন ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০ প্রজাতির আঙুর চাষ হচ্ছে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় আঙুর চাষ করলে ফল টক হয় এমন প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন হেলাল উদ্দিন। 

সরেজমিনে দেখা যায়, হেলাল উদ্দীনের এই আঙুর বাগান দেখতে ভিড় করছেন জেলার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। অনেকেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন আঙুর চাষের। হেলাল উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তাদের হাত ধরে সাতক্ষীরায় কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বেকার যুবকদের জন্যও তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।

হেলাল উদ্দীনের স্ত্রী আলেয়া বেগম জানান, প্রথমে ইউটিউব দেখে আমার স্বামী দুটি আঙুরের চারা দুই হাজার টাকা দিয়ে কিনে তা বাড়ির আঙিনায় রোপণ করেছিলেন। এরপর আমি তাকে বকাবকি করেছিলাম, আঙুর কী বাংলাদেশে হয়? এত টাকা দিয়ে কেনার কী প্রয়োজন? তবে, আমার স্বামী এসময় আমাকে বলেন, দেখি না কী হয়। একপর্যায়ে কিছুদিন পর ওই গাছে ফল আসলে আমাদের ধারণাই পরিবর্তন হয়ে যায়। ওই ফল খুবই মিষ্টি এবং সুস্বাদু হয়। এরপর বাইপাসে ১৫ কাঠা জমিতে এই আঙুর বাগান করেছি। এই বাগানের বয়স ৯ মাস। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির মোট ১২৬ টি গাছ রয়েছে। এখানে আমি আমার স্বামীর সাথে বাগান পরিচর্যা করি। মাশাল্লাহ, আমাদের বাগানে ভালো আঙুর হয়েছে এবং তা খুব মিষ্টি ও সুস্বাদু।

কৃষি উদ্যোক্তা হেলাল উদ্দীন বলেন, আজ থেকে তিন বছর আগে শখের বশে বাড়ির আঙিনায় দুটি আঙুর গাছের চারা লাগাই। ওই চারা থেকে আমি ভালো ফলনও পাই। এরপর সিদ্ধান্ত নিই বাণিজ্যিকভাবে আঙুরের চাষ করবো। সেই ভাবনা থেকেই ৯ মাস আগে শহরের বাইপাস এলাকায় বছরে ১৫ হাজার টাকা করে দিয়ে ১৫ কাঠা জমি বর্গা (লিজ) নিয়ে আঙুর চাষ শুরু করি। সেখানে আমার মোট খরচ হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। আল্লাহর রহমতে বর্তমানে আমার বাগানে আঙুরের যথেষ্ট ভালো ফলন হয়েছে। ইতোমধ্যে আঙুরের প্রথম চালান বিক্রি করে আমার খরচ উঠে গেছে। আঙুর চাষে প্রথম একবারই খরচ করতে হয়। এরপর গাছের পরিচর্যা ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। এই গাছ ৪০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে এবং ১২ মাস ফল দেয়। 

তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি মাসে আঙুরের ফলন বেশি হয়। দেশের বর্তমান আবহাওয়ায় এই ফল চাষে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি। তাই আমার মতো যে কেউ এখন বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করতে পারেন। আমার এখানে বর্তমানে কালো, লাল, সবুজ ও হলুদসহ ২০ প্রজাতির আঙুর গাছ রয়েছে। আমি আরো ১ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে সেখানে কাজ শুরু করেছি। সঠিক জাত নির্বাচন ও পরিচর্যার মাধ্যমে দেশীয় মাটিতেও উন্নত মানের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব বলে জানান তিনি। 

আঙুরের বাগান দেখতে আসা সাতক্ষীরা শহরের একরামুল ইসলাম জনি বলেন, সাতক্ষীরায় এই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ হয়েছে। তাই আমার বন্ধু আবির হোসেনকে নিয়ে এই বাগানটি দেখতে এসেছি। বাগানটি দেখে খুবই ভালো লেগেছে আমাদের। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বাগান থেকে কিছু চারা নিয়ে আঙুরের বাগান করবো। এখানে আঙুরের ভালো ফলন হয়েছে। আমরা খেয়েও দেখেছি, এখানকার আঙুর খুব মিষ্টি ও সুস্বাদু। কৃষি বিভাগ যদি আঙুর চাষীদের পরামর্শ ও সহযোগিতা করে, তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই আঙুর বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো. মনির হোসেন বলেন, আঙুর একটি নতুন ফসল হিসেবে সাতক্ষীরায় এর আবাদ শুরু হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর ও কলারোয়া উপজেলার দুই জন কৃষক প্রাথমিকভাবে এই আঙুর চাষ শুরু করেছেন। এখানে ২০ থেকে ৮০ জাতের আঙুর চাষ হচ্ছে। আমাদের যে পতিত জমিগুলো রয়েছে সেখানে আঙুর চাষ করা গেলে কৃষকরা লাভবান হবেন। 

তিনি বলেন, জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আঙুর উৎপাদন করতে পারলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য জেলায় আঙুর বিক্রি করা যাবে। আবহাওয়া ও মাটির গুনগুনের ভিত্তিতে সাতক্ষীরার আম ও কুলের যেমন : স্বাদ রয়েছে, ঠিক তেমনি আঙুরের স্বাদ যদি আমরা একইভাবে আনতে পারি, তাহলে আঙুরেরও ব্যাপক চাহিদা থাকবে। সাতক্ষীরার পতিত জমিগুলো ব্যবহার করে আঙুর চাষ করা গেলে কৃষিতে আরো একধাপ উন্নতি হবে বলে আমি মনে করি।