বাসস
  ০৭ জুন ২০২৬, ১৯:৪৩
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ১৯:৫৬

রাজশাহী অঞ্চলে কৃষিতে নতুন আশা জাগাচ্ছে পদ্মা ব্যারাজ

ছবি : এআই

মো. আয়নাল হক

রাজশাহী, ৭ জুন, ২০২৬ (বাসস) : শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটের কারণে রাজশাহী অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টরের চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। প্রতি বছর কৃষকেরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এবার পদ্মা ব্যারাজ কৃষিতে নতুন আশা জাগাচ্ছে। এর মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে রাজশাহী অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ উপকৃত হবেন।

ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা করতে রাজবাড়ীর পাংশায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমের বিপুল পরিমাণ পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যারাজ কৃষকদের ভাগ্য আমূল বদলে দেবে।

কর্মকর্তারা জানান, এই সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পদ্মার শাখা নদীগুলোর নব্যতা ফিরিয়ে আনবে। লবণাক্ততা রোধ করে সুন্দরবন রক্ষা করা যাবে। পাশাপাশি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি সরবরাহও নিরবচ্ছিন্ন থাকবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, এই প্রকল্পটি কেবল আঞ্চলিকভাবেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হতে যাচ্ছে।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, আমরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। সেই ভূগর্ভস্থ পানি তোলার পরিবর্তে আমরা এখন সেচের জন্য ভূ-উপরিস্থ (নদীর) পানি ব্যবহার করতে পারব।

তিনি আরও বলেন, রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে; তাদের কুলিং (শীতলীকরণ) কাজের জন্যও আমরা এ উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পানি পাব। আমাদের অঞ্চলের কৃষকদের দীর্ঘদিনের দাবি, যার জন্য আমরা আন্দোলন করেছি, তা অবশ্যই সফল হবে।

নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেছিলেন, রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ও পানি সমস্যার সমাধানে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে।

তিনি বলেন, ‘ধানের শীষ’ এর সরকার গঠিত হলে ইনশাআল্লাহ আমরা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কাজ শুরু করব। আমরা যদি পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করতে পারি, তাহেল রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাই- এই পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।

রাজশাহীর কৃষকরা জানান, পানির অভাবে ধান চাষ করা যাচ্ছে না। এ কারণে তাদের বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। পানি পাওয়া গেলে তাদের জন্য খুব ভালো হবে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বরগাছী গ্রামের কৃষক আবু তাহের বলেন, পদ্মায় পানি স্বাভাবিক থাকলে গভীর নলকূপের পানির কোনো সমস্যা হবে না। তখন চাষাবাদেও সমস্যা থাকবে না। বিশেষ করে আমরা যারা চরে চাষাবাদ করি, তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হব।

বাঘা উপজেলার কিশোরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বশির বলেন, শীতকাল থেকেই পদ্মার পানি কমতে শুরু করে। ওই সময় আমরা চাষাবাদ নিয়ে সমস্যায় পড়ি। চৈত্র মাসে পানির জন্য আমাদের সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। পানি ধরে রাখা গেলে অনেক দিক থেকে সুবিধা হবে। এছাড়া মানুষের চরে যাতায়াতও অনেক সহজ হয়ে যাবে।

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পানি ধরে রাখা গেলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত নদীর পানির স্তর তুলনামূলকভাবে উঁচুতে রাখা সম্ভব হবে। ব্যারাজে জমা হওয়া পানি বিভিন্ন নদীপথে প্রবাহিত হবে এবং শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীর পানি প্রবাহ সচল রাখা যাবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের পানির সংকট কমে আসবে।

পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ বিলিয়ন লিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পুনরুজ্জীবিত হবে সেচ প্রকল্পগুলোও। পদ্মা ব্যারাজ এবং গঙ্গা অফ-টেক স্ট্রাকচারে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। সেখান থেকে বার্ষিক প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে, যা হিসনা-মাথভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাসিয়া, ইছামতি এবং বড়াল নদী ব্যবস্থার প্রবাহ ফিরিয়ে আনবে।

এ ছাড়া গড়াই ও বড়াল নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রায় ৩৪০ কিলোমিটার নদী খনন (ড্রেজিং) করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে এই ব্যারাজের মাধ্যমে প্রতি সেকেন্ডে ন্যূনতম ৫৭০ ঘনমিটার পানি ছাড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।