শিরোনাম

ঢাকা, ১৪ মে, ২০২৬ (বাসস) : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেছেন, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমনে জোরালো ভূমিকা রাখছে সরকার।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বাংলাদেশ এই সমস্যা সমাধানে অত্যন্ত আন্তরিক এবং আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী আইন প্রণয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন তিনি।
মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ২০০০ সালে গৃহীত জাতিসংঘ কনভেনশন (ইউএনটিওসি) এবং এর সম্পূরক প্রোটোকলগুলোর আলোকে সরকার মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬ প্রণয়ন করেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সহযোগিতায় আজ রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আজ এ তথ্য জানান।
মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘নতুন এই আইনে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার পাশাপাশি ভিকটিমদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইন প্রতারণা, স্ক্যামিং এবং মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধগুলোকে এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। মানব পাচার প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম কর্মীদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা খান। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
কর্মশালায় জানানো হয়, নতুন এই আইনের মাধ্যমে মানব পাচার অপরাধের প্রকৃতি ও ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত সংস্থাগুলোকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে। অভিযুক্তের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা, সম্পত্তি আটক করা এবং আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার করার মতো যুগান্তকারী বিধান এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া অভিবাসী চোরাচালানের উদ্দেশ্যে পাসপোর্ট বা ভিসা জালিয়াতিকেও কঠোর শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে মূলত অভিযুক্তদের আর্থিক জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যাবে বলে কর্মশালায় আশা করা হয়।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬-এ নতুনভাবে সংযোজন ও পরিবর্তন করা হয়েছে। ২০১২ সালের আইনে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালানকে সঠিকভাবে আলাদা করা হয়নি। নতুন আইনে এই দু’টিকে পৃথক অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
মানব পাচারের সংজ্ঞাকে জাতিসংঘের টিআইপি প্রোটোকলের সঙ্গে এবং অভিবাসী চোরাচালানকে (এসওএম) প্রোটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান সংক্রান্ত সব বিধান এই আইনের আওতায় আনা হয়েছে।
এতে বলা হয়, পাচারকারীকে তার সম্পত্তি ব্যবহার করতে দিলে বা নথি গোপন করে সহায়তা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদ- এবং সর্বনিম্ন ৩০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে কিছু আমদানি বা স্থানান্তর করলে ৩ থেকে ১০ বছরের কারাদ- এবং সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। অনলাইনে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপন বা অভিবাসনের নামে প্রতারণা করলে ৩ থেকে ৭ বছরের কারাদ-ের বিধান যুক্ত হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে পাচারকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও আয়-সম্পদ যাচাইয়ে ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। মানব পাচার ট্রাইব্যুনাল এখন থেকে পাচার সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধের যেমন আঘাত, মাদক পাচার বা যৌন সহিংসতার বিচারও একই সঙ্গে করতে পারবে, যা আগে আলাদা আদালতে করতে হতো। বিদেশে অবস্থিত সম্পদ জব্দ বা বাজেয়াপ্ত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরো জোরদার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে ৩ থেকে ৭ বছর এবং আপস করতে বাধ্য করলে ২ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। পাচারের শিকার থাকাকালীন ভুক্তভোগী যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো নির্দিষ্ট অবৈধ কাজ যেমনÑ জাল পাসপোর্ট বহন বা অনুপ্রবেশ করলে তাকে আসামি হিসেবে গণ্য না করার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ভুক্তভোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রতি ৬ মাস অন্তর প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
কর্মশালায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ৪৮ জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।
এই আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে অবৈধ পথে বিদেশ গমনের প্রবণতা হ্রাস পাবে এবং মানব পাচার চক্রের মূলোৎপাটন সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করেন বক্তারা।