বাসস
  ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০:০৯
আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ২০:৫৯

জিয়া থেকে তারেক রহমান : আবার জেগে উঠছে উলাশি খাল

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে অর্ধশত বছর আগে উলাশি খাল কেটেছিলেন আব্দুল বারিক মন্ডল। ছবি : বাসস

মো. সাইফুল ইসলাম

যশোর, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ (বাসস) : যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি এমন এক নাম, যা গ্রামীণ জাগরণ, স্বেচ্ছাশ্রম এবং কৃষি বিপ্লবের অনন্য ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

প্রায় ৫০ বছর আগে যে খালটি এই এলাকার ভাগ্য বদলে দিয়েছিল, তা দীর্ঘদিনের অবহেলায় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে, এর প্রাণ ফিরিয়ে আনতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে পুনরায় খনন কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছেন, যে পথ একসময় দেখিয়েছিলেন তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।

আগামী ২৭ এপ্রিল উলাশি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে, যা কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং ইতিহাসের পুনর্জাগরণ।

উলাশির মানুষ এখনো ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বরের কথা স্পষ্টভাবে মনে রেখেছে। সেদিন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে খাল খননের সূচনা করেন।

তাঁর এই প্রতীকী উদ্যোগ দ্রুতই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে রূপ নেয়। স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্যমতে, হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় শ্রম দেন কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই, সাধারণ খাবার হিসেবে রুটি ও গুঁড় খেয়ে তারা কাজ করেছেন।

মাত্র ছয় মাসের মধ্যে উলাশি থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়, যা পুরো এলাকাকে কৃষির জন্য উপযোগী করে তোলে।

এই খাল প্রায় ২২ হাজার একর জমিকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এবং পাঁচটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশনের পথ তৈরি করে। পাশাপাশি সেচব্যবস্থা চালু হয় এবং খালের পাশে ২০টি পাম্প বসানো হয়।

যে জমি বছরের বেশিরভাগ সময় পানির নিচে থাকত, তা পরিণত হয় উর্বর কৃষিজমিতে। ইরি ও বোরো ধানের চাষ বাড়ে, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং শার্শা ধীরে ধীরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খনন করা উলাশি খাল। ছবি : বাসস

বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সী আবু বকর সিদ্দিকী তখন ছিলেন বয়সে কিশোর। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে মাটি কাটেন, ঝুড়িতে ভরে আমার বাবার মাথায় তুলে দেন। তাঁকে দেখে মানুষ স্বেচ্ছায় খনন কাজে যোগ দেয়।’

আরেক প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল বারিক মন্ডল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টার থেকে নেমে হেঁটে খননস্থলে আসেন। তিনি স্থানীয় এক সদস্যের মাথার টুপি নিয়ে নিজেই পরেছিলেন- তিনি এতটাই মানুষের কাছাকাছি ছিলেন।’

সময়ের সাথে সাথে ঐতিহাসিক এই খাল গুরুত্ব হারায়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনঃখননের অভাবে এটি ভরাট হয়ে যায় এবং প্রায় মৃত অবস্থায় পৌঁছায়। পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা আবার জলাবদ্ধতা ও উৎপাদন হ্রাসের সমস্যায় পড়েন।

স্থানীয় বাসিন্দা আহমদ আলী বলেন, ‘খালটি আবার সচল হলে কৃষকের অনেক উপকার হবে। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় আছি।’

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই দিন এখন সামনে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে খাল পুনঃখনন শুরু হতে যাচ্ছে। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি একটি ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং একটি স্বপ্নের পুনর্জন্ম।

খালের পাশে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক উদ্যোগের স্মৃতিস্তম্ভ এখনো দাঁড়িয়ে আছে নীরব সাক্ষী হয়ে। তার পাশেই নতুন প্রজন্ম আবারো সোনালি দিনের স্বপ্ন দেখছে।

উলাশি খালের পুনঃখনন শুধু মাটি কাটার কাজ নয়, এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে উন্নয়ন দর্শনের উত্তরাধিকার।

যে কোদাল একসময় কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছিল, আজ সেই কোদালই আবার তুলে নেওয়া হচ্ছে উত্তরসূরির হাতে। উলাশির মানুষ বিশ্বাস করে, এই উদ্যোগ আবারো তাদের জীবন বদলে দেবে এবং হারানো সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনবে।

৫০ বছর আগের সেই দৃশ্য যেন আবার ফিরে আসছে, প্রতিটি কোদালের আঘাতে জেগে উঠছে মাটি, আর সেই মাটিতেই রচিত হচ্ছে নতুন ইতিহাস।