শিরোনাম

মো. মামুন ইসলাম
রংপুর, ২৯ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : সদ্য বাস্তবায়িত ইআইআর প্রকল্প বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে ফসলের ফলন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাস্তুতন্ত্র (পরিবেশ ব্যবস্থা) পুনরুজ্জীবন, ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণে কার্যকর অবদান রাখছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছর মেয়াদী (২০১৯-২০২৫) ‘ভূ-উপরিস্থ পানির সর্বোত্তম ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুর জেলায় সেচ সম্প্রসারণ (ইআরপি)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।
বৃহত্তর রংপুর জেলার রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার ৩৫টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য হলো— ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ, বিস্তীর্ণ এলাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তকরণ, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সেচ ও সম্পূরক সেচ প্রদান, বনায়ন, বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং পরিবেশের উন্নতি সাধন।
বিলুপ্ত নদী, খাল, বিল ও পুকুর পুনঃখনন এবং সেগুলোর তীরে ব্যাপক বৃক্ষ রোপনের মাধ্যমে এই জলাধারগুলো বিপন্ন শৈবাল, মাছ, পাখি, প্রাণী এবং অন্যান্য প্রাণিকূলের অভয়ারণ্যে রূপান্তরিত হয়েছে, যা এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
গ্রামীণ মানুষ কৃষি, মৎস্য চাষ, বৃক্ষরোপণ, পশুখাদ্যের জন্য শাকসবজি, কলা ও ঘাস চাষ এবং জীবিকা উন্নত করার জন্য হাঁস পালনের মাধ্যমে এই প্রকল্প থেকে নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
পুনঃখনন করা বিলুপ্ত খাল, নদী, বিল এবং পুকুরগুলো এখন বিভিন্ন দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির কলতান, জলজ উদ্ভিদ, বিলুপ্ত প্রাণী ও কীটপতঙ্গ এবং তীরের বিরল প্রজাতির গাছে পরিপূর্ণ, যা এক মনোরম দৃশ্যের সৃষ্টি করেছে।

বিএমডিএ কর্মকর্তারা জানান, ৩৩টি বিলুপ্ত খাল ও অনেক বিলুপ্তপ্রায় নদী এবং বহু বিল ও পুকুর পুনঃখননের ফলে চার দশক পর ৩০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়েছে, যা চাষযোগ্য হয়ে উঠেছে। এতে ২ লাখ মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
ভূ-পৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ সংশ্নিষ্ট ইআইআর প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন এই অঞ্চলের কৃষকদের বছরে ৭০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ২ লাখ টনেরও বেশি অতিরিক্ত আমন ধান উৎপাদনে সহায়তা করছে।
এছাড়াও, এই পুনঃখনন করা জলাধারগুলোতে সঞ্চিত বৃষ্টির পানি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূণর্ভরণ এবং ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণ ও কৃষি এবং গৃহস্থালির কাজে এর সর্বোত্তম ব্যবহারে অবদান রাখছে।
কৃষকরা বলেন, এই প্রকল্পের অধীনে বিলুপ্ত জলাশয়গুলি পুনঃখননের ফলে তাদের জমি কয়েক দশকের জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়েছে, যা তাদের গত চার দশকে প্রথমবারের মতো প্রতি বছর আমন ধান এবং আরো দু’টি ফসল চাষ করতে সক্ষম করেছে।
ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি, তারা বিলুপ্ত জলাশয়গুলোতে হারিয়ে যাওয়া বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন এবং নতুন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পুনরায় ফিরে আসতে দেখছেন।
রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার সংকরপুর গ্রামের কৃষক মশিউর রহমান বলেন, বিলুপ্তপ্রায় মরা তিস্তা নদী পুনঃখননের ফলে তার ২ দশমিক ৬২ হেক্টর জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়েছে এবং চার দশক পর তিনি সেখানে আমন ধান চাষ করতে সক্ষম হয়েছেন।
একই গ্রামের গৃহিণী হালিমা খাতুন ও মাহফুজা বেগম বলেন, মরা তিস্তা নদী পুনঃখননের পর তারা নদীর তীরে হাঁস পালন এবং কলা, শাকসবজি ও নেপিয়ার ঘাস চাষ করে তাদের জীবিকার উন্নতি করছেন।
একই গ্রামের আব্দুল হালিম ও মোহাম্মদ তুহিন বলেন, তারা পুনঃখনন করা মরা তিস্তা নদীতে মাছ ধরছেন। যেখানে নদীর তীরে গাছের চারা রোপণের ফলে প্রকৃতি সবুজ হয়ে উঠেছে এবং বাস্তুতন্ত্রও পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে।
রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার ১১ দশমিক ৫৯ একরের জলাশয়সহ ভারাড়দহ বিল পুনঃখননের মাধ্যমে এর ১০০ ফুট প্রশস্ত তীরে ২১৩ প্রজাতির দুর্লভ কাঠ, ফল, ঔষধি ও ফুলের ৬ হাজার ৫০০ গাছ লাগিয়ে একটি সুন্দর ভূদৃশ্য তৈরি করা হয়েছে।
নিকটবর্তী ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের আবদুর রহমান বলেন, প্রচুর জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী, দেশি ও পরিযায়ী পাখিতে সমৃদ্ধ বিলটি পুনরুজ্জীবিত বাস্তুতন্ত্রে মাছ, পাখি ও প্রাণীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে বহু মানুষ সেখানে ভিড় করছেন।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বেরুবাড়ি ইউনিয়নের আবদুল মোতালেব বলেন, বিএমডিএ বোয়ালেরদারা খালটি পুনঃখনন করেছে। যার ফলে ২৫টি গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ উপকৃত হয়েছেন।
তিনি বলেন, খালটি পুনঃখনন এবং এর তীরে পর্যাপ্ত সংখ্যক গাছ রোপণের ফলে পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। স্থানীয় লোকজন সংরক্ষিত পানি সেচ, হাঁস পালন, মাছ চাষ এবং গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করছেন।
নিকটবর্তী চর বেরুবাড়ি গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, খালটি পুনঃখননের ফলে তার দুই একর জমি জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হয়েছে এবং চার দশক পর সেখানে বছরে তিনটি ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিএমডিএ’র সুপারিনটেন্ডিং ইঞ্জিনিয়ার এবং ইআইআর প্রকল্পের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান খান বাসস-কে জানান, বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের বহু মানুষ এই প্রকল্প থেকে ব্যাপক সুফল পাচ্ছেন।
প্রকল্পটি সংরক্ষিত ভূপৃষ্ঠের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার করে কৃষির উন্নয়ন, বনায়ন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উন্নতি সাধন এবং মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণী, কীটপতঙ্গ ও পাখিদের জন্য বাস্তুতন্ত্র ও অভয়ারণ্য পুনরুজ্জীবিত করেছে।
কৃষকরা পুনঃখনন করা জলাশয়ে সংরক্ষিত ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করে ফসলি জমিতে সম্পূরক সেচ দিচ্ছেন এবং আরো বেশি ফসল ও সবজি উৎপাদন করছেন, যার মধ্যে বার্ষিক ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের ২ লাখ টন অতিরিক্ত আমন ধানও অন্তর্ভুক্ত।