শিরোনাম

ঢাকা, ১৫ মার্চ, ২০২৬ (বাসস) : মাহে রামজানে দুপুর পেরিয়ে বিকেল হতেই বদলে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চিত্র। টিএসসি, মল চত্বর, কার্জন হলসংলগ্ন মাঠ ও বিভিন্ন হলের আঙিনায় শুরু হয় শিক্ষার্থীদের পদচারণা। ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একজন-দুজন করে জড়ো হতে হতে তৈরি হয় ছোট ছোট আড্ডার বৃত্ত। সন্ধ্যার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে থেকেই প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে ওঠে পুরো ক্যাম্পাস।
রমজান এলেই এই প্রাণবন্ত পরিবেশ চোখে পড়ে। কেউ দল বেঁধে ইফতারের খাবার কিনতে ছুটছেন, কেউ আবার সেগুলোর পসরা সাজাতে ব্যস্ত। গল্প, হাসি আর আন্তরিকতার আবহে একসঙ্গে ইফতার করেন সবাই। ইফতারের এই আয়োজন পরিণত হয় এক উষ্ণ মিলনমেলায়, যেখানে বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।
বিকেল নাগাদ একসঙ্গে ইফতার করার আনন্দে শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে পরিকল্পনায়; কোন কোন আইটেম থাকবে, কে কী আনবে, সব কিছু ঠিক হয় হাসি-আড্ডার মধ্যেই। হলগুলোর সামনের চিত্রও একেবারেই অন্যরকম। প্রায় সব হলের সামনে বাহারি ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। ৫টি হল পাশাপাশি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়া এলাকার আমেজ একটু বেশিই মনোমুগ্ধকর। ফল, শরবত, ছোলা, বেগুনি, পেঁয়াজু, হালিম, কাবাবসহ নানা স্বাদের পদে জমে ওঠে ইফতারের বাজার। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে তখন রমজানের উৎসবমুখর পরিবেশ। ক্যাম্পাস জুড়ে ইফতার আয়োজনের দৃশ্য চোখে পড়ার মত।
ইফতারের এই আয়োজন হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছে আরও বিশেষ গুরুত্ববহ। পরিবার থেকে দূরে থাকা অনেকের জন্য এই সম্মিলিত ইফতারই হয়ে ওঠে এক ধরনের পারিবারিক পরিসর। একজন অন্যজনের প্লেটে তুলে দেন খাবার। আজকের অতিথি হয়তো অন্য বিভাগের, হয়তো নতুন পরিচিত, তবু ইফতারের মুহূর্তে সবাই যেন এক বৃত্তে আবদ্ধ।
তবে এটি শুধু বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় সীমাবদ্ধ নয়, ইফতারকে ঘিরে ক্যাম্পাসে তৈরি হয় বিভিন্ন সংগঠনের মিলনমেলা। বিভাগভিত্তিক সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম, এমনকি বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনও আয়োজন করে সম্মিলিত ইফতার। এসব আয়োজনে অংশ নেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকও।
আজানের ধ্বনি ভেসে এলে মুহূর্তেই নেমে আসে এক অন্যরকম নীরবতা ও প্রশান্তি। থেমে যায় ব্যস্ততা, শুরু হয় সংযম ভাঙার সেই প্রতীক্ষিত সময়। খেজুর মুখে দিয়ে পানি পান, তারপর ধীরে ধীরে শুরু হয় ইফতার।
ইফতারের মুহূর্তে ব্যক্তিগত পরিচয় বা মতভেদ ম্লান হয়ে যায়; সামনে আসে কেবল একসঙ্গে থাকার আনন্দ। ভিন্ন ধর্ম বা সংস্কৃতির শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনের অংশ হয়ে ওঠেন, যা ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করে। ইফতারের পরও শেষ হয় না মিলনমেলা, কেউ নামাজে যান, কেউ চায়ের আড্ডায় মেতে ওঠেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্মিলিত ইফতার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনন্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। বছর ঘুরে নতুন শিক্ষার্থীরা এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, আর পুরোনোরা স্মৃতির টানে ফিরে আসে একই আয়োজনের কাছে। খোলা যায়গায় মাদুর পেতে বসে কিংবা জড়ো হয়ে একসাথে ইফতার করা যেন এখন রমজানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।