শিরোনাম

শফিকুল ইসলাম বেবু
কুড়িগ্রাম, ১২ মার্চ, ২০২৬ (বাসস): দীর্ঘদিনের ভরাট, নাব্যতা সংকট ও নদীভাঙনের জন্য পরিচিত আন্তঃসীমান্ত ধরলা নদীতে চলমান ড্রেজিং কার্যক্রমের ফলে নদীর গভীরতা বাড়ছে, কমছে ভাঙন এবং তীরবর্তী মানুষের জীবনে ফিরছে স্বস্তি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভারতের কুচবিহার থেকে উৎপত্তি হয়ে পাটগ্রামের চ্যাংড়াবান্ধা হয়ে লালমনিরহাটের মোগলহাট দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা ধরলা নদী কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী, সদর ও উলিপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে উলিপুরের বুড়াবুড়ি এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে মিলিত হয়েছে। প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও গড়ে ১ দশমিক ২ কিলোমিটার প্রশস্ত এ নদীটি দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন ও গতিপথ পরিবর্তনের কারণে তীরবর্তী মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ ছিল।
নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ‘পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর নাব্যতা উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর ২৬৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাটেশ্বরী এলাকা থেকে উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদী খনন কাজ শুরু হয়।
বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরচন্দ্র পাল জানান, নদীর নাব্যতা রক্ষায় পানির লেভেল থেকে সাড়ে আট ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি দুইটি প্যাকেজের আওতায় সাতটি লটে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং বর্তমানে ১৪টি কাটার সাকশন ড্রেজারের মাধ্যমে কাজ চলছে।
তিনি জানান, প্রকল্পের আওতায় ১ কোটি ৬০ লাখ ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ ঘনমিটার মাটি ও বালি উত্তোলন করা হয়েছে। উত্তোলিত মাটি ও বালি নদীর তীরবর্তী বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, খাস জমি, নিচু জমি ভরাট এবং ভাঙনপ্রবণ এলাকায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া ধরলা সেতু সংলগ্ন প্রস্তাবিত ৩০ একরের ডিসি পার্কের গর্ত ভরাটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ফ্লাড শেল্টার এলাকায়ও এসব মাটি ব্যবহার করা হয়েছে। ড্রেজিংকৃত বালুর একটি অংশ রয়্যালটির মাধ্যমে বিক্রি করে ইতোমধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৮১ হাজার ১১১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে।
প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুনে। বর্তমানে প্রায় ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ড্রেজিং কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে তীরবর্তী এলাকায় দেখা যাচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, নদীর গভীরতা বাড়ায় বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং ভাঙনের ঝুঁকি আগের তুলনায় কমেছে।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের পাটেশ্বরী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, আগে বর্ষা এলেই বাড়িঘর নদীতে ভেঙে যাওয়ার আতঙ্কে রাত জেগে পাহারা দিতে হতো। এখন নদী অনেকটা শান্ত হয়েছে এবং ভাঙনের ভয়ও আগের মতো নেই।
মোগলবাসা ইউনিয়নের সিতাইঝার গ্রামের কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, নদীভাঙনে তারা অনেক জমি হারিয়েছেন। তবে খননের মাটি দিয়ে পতিত নিচু জমি ভরাট হওয়ায় কিছু জমি আবার চাষের উপযোগী হয়েছে।
উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের সরকার পাড়ার বাসিন্দা জয়নব বেগম বলেন, আগে বর্ষায় পানি জমে থাকায় ঘরবাড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তা থাকত। এখন পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় মানুষ আবার নদীর কাছে বসবাসের সাহস পাচ্ছে।
২০২৫ সালের ২২ মে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ধরলা নদী খনন কার্যক্রম নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তৎকালীন জেলা প্রশাসক নুসরাত সুলতানা বলেন, নদী খননের ফলে বর্ষা মৌসুমে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে এবং নদীভাঙন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। খননকৃত মাটি দিয়ে অতীতে নদীভাঙনের ফলে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন নালা ভরাট করায় কয়েকশ একর জমি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ১৯৫০ সাল থেকে জেলার ১৬টি নদ-নদীতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ধরলা নদীর ভাঙনে হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে ঠিকানা বদল করতে বাধ্য হয়েছে। পাটেশ্বরী থেকে বেগমগঞ্জ পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার খননের ফলে ভাঙন অনেকাংশে কমেছে। তবে পুরো সুফল পেতে ফুলবাড়ীর নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের কর্ণপুর এলাকা থেকে বেগমগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার পুরো নদী খনন করা জরুরি।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন জানান,‘নদী খননের ফলে উত্তোলিত বালু ও মাটি দিয়ে নদীর দুই তীরের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়্যালটির মাধ্যমে এক কোটি ৭৩ লাখ ৮১ হাজার ১১১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে।’
বিআইডব্লিউটিএ’র অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ধরলা নদীর ড্রেজিং কার্যক্রমের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। জনগণের স্বার্থে পুরো নদীতে খনন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।
স্থানীয়দের আশা, চলমান প্রকল্প সফলভাবে শেষ হওয়ার পাশাপাশি পুরো ধরলা নদীজুড়ে খনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হলে ভাঙন আতঙ্ক থেকে স্থায়ী মুক্তি পাবে নদীতীরবর্তী লাখো মানুষ।