শিরোনাম

কামরুল হাসান
কুমিল্লা, ৯ মার্চ ২০২৬ (বাসস): রসমালাই আর সূক্ষ্ম খাদির মতোই কুমিল্লায় লুকিয়ে আছে আরেকটি সোনালি সম্পদ বাটিক শিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাতে হাতে গড়ে ওঠা এই শিল্প যেন কুমিল্লার প্রাণস্পন্দন। ঐতিহ্যের নীরব গর্ব। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় তার দীপ্তি কিছুটা ম্লান হলেও এখনও বেঁচে আছে স্বপ্ন। চোখে ধুলো নয়, আলো নিয়ে বেঁচে থাকা ছোট ছোট উদ্যোক্তাদের স্বপ্নের শিল্পটি হলো বাটিক।
এবার ঈদ বাজারে কুমিল্লার মার্কেটগুলোতে আলো ছড়াচ্ছে বাটিক, শাড়ি, থ্রি পিস, বেডশিট, পাঞ্জাবি ও থান কাপড়৷ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় থাকছে বাটিকের পোশাক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৫০ বছর আগে কুমিল্লার সদর উপজেলার কমলপুর গ্রামে লাল মিয়া ও মোহন মিয়া নামে দুই ভাইয়ের হাত ধরে বাটিক শিল্পের যাত্রা শুরু হয়। ভারত থেকে শিখে আসা দুই ভাইয়ের বাটিক আজ সময়ের সাথে সাথে সুনাম ছড়িয়েছে সারাদেশে। কমলপুর ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামে গড়ে উঠেছে প্রায় ২৫টি কারখানা। এসব কারখানায় নান্দনিক ডিজাইনের বাটিক, শাড়ি, থ্রি-পিস, শার্ট, লুঙ্গি ও বেডশিট তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হচ্ছে এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়ে সুনাম অর্জন করছে।
কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী খাদির পরই জনপ্রিয়তার দিক থেকে বাটিক এখন অন্যতম। কুমিল্লা নগরীর মনোহরপুর, কান্দিরপাড় ও রামঘাট এলাকার প্রায় দুই শতাধিক দোকানে কুমিল্লার বাটিক পণ্য পাওয়া যায়। প্রতিদিন ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই কর্মশালাগুলো জেগে ওঠে রঙের ঘ্রাণে, গরম পানির বাষ্পে, আর কারিগরের যত্ন মাখা স্পর্শে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ গরম পানিতে তুলে ফেলছেন কাপড়ের অপ্রয়োজনীয় ‘মাড়’, কেউ আবার রঙের কড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি করছেন নীল, হলুদ, লাল আর মাটির রঙের অপূর্ব মায়াজাল। সেই রঙিন কাপড়েই আবার মোমের নকশা, ফুলের ছাপ, ঢেউয়ের রেখা, অয়নের বদলের গল্প যেন কাপড়ে আঁকা হয়।
দীর্ঘ ১২ বছর বাটিকের কারখানায় কাজ করেন হামিদ চৌধুরি। তিনি কাপড়ের বিহারি, ওয়াশ ও ডাইন করেন। একাই সামলাচ্ছেন তিনটি কাজ। তিনি বলেন, বিহারি শেষ করে এসে মোম তুলি, এর মাধ্যমে কাপড়টিকে ওয়াশ করা হয়, ফলে কাপড়টি ক্লিয়ার হয়।
বাটিকের কারিগর মুশফিকুর রহমান মোন্না বাসসকে বলেন, আমি থ্রি-পিছের কাজ করি। আমাদের কাছে সাদা কাপড় আসে, আমরা সেটিকে মোম দিয়ে ব্লক করি। এর উপরে আবার মহিলারা তুলি করে, আবার এক কালারেও রাখা হয়। সারাদিনে ২০-৩০টা থ্রি পিসের সম্পূর্ণ মোম ব্লক করতে পারি।
মাঠের দিকে তাকালে দেখা যায়, সারি সারি কাপড় বৃষ্টি শেষে রোদে ভেজা মাটির মতো শুকিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজন কর্মী সারাক্ষণ ছুটছেন, উলটে দিচ্ছেন, সোজা করছেন, রোদের আলোয় যেন প্রতিটি নকশা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রথম ধাপে রং শুকিয়ে গেলে শুরু হয় এক নতুন শিল্পযাত্রা। নারীদের কোমল হাতে ধরা তুলি যেন জাদুর ছোঁয়া। একজন কাপড়ের উপর তারা মেখে দেন ভিন্ন ভিন্ন রঙের হাসি। সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে, অসীম মমতায় তারা রং ঢেলে দেন কাপড়ে। প্রতিটি আলতো স্পর্শে জন্ম নেয় আরও গভীর সৌন্দর্য, আরও উজ্জ্বল নকশা, আরও প্রাণবন্ত জীবন।
বিশাল মাঠে ছড়ানো সারি সারি বাটিক কাপড়, সেখানে কাপড়ের উপর তুলি করছেন নারী কর্মীরা। তারা বলেন, আমরা সবাই মিলেমিশে কাজ করি। কেউ না বুঝলে অভিজ্ঞরা তাদের বুঝিয়ে দেয়। তুলি মারলে কাপড়টা আরেকটু নান্দনিক লাগে। একদিনে প্রতিজনে ৩০-৪০টা কাপড়ে তুলি মারতে পারি।
কাপড় ভাজ করে রাখছেন রিতু আক্তার। তিনি গত তিন মাস আগে এখানে জয়েন করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন মহাজন যেই কাজগুলো ভাগ করে দেয়, আমরা সেগুলো করি। যার যার কাজ ও যোগ্যতার উপর বেতন নির্ধারণ করা থাকে। যে বেশি বুঝে তার বেশি। কম বুঝলে কম। তবে মালিকের ব্যবহার ও বেতন ভাতায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন রিতু আক্তার।
মহাজনেরা মাপ কেটে বুঝিয়ে দেন প্রতিটি কাপড়ের ভবিষ্যৎ। তাদের নির্দেশে প্রতিদিন তৈরি হয় প্রায় পাঁচ শতাধিক বাটিক, কখনো শাড়ি, কখনো থ্রি-পিস, কখনো আবার লুঙ্গি।
কুমিল্লা নিউ বাটিক ঘরের স্বত্বাধিকারী আবু সাইদ বলেন, আমার কোম্পানিতে প্রতিদিন ১৫-২০ জন লোক কাজ করে। কেউ রং করে, কেউ মোম লাগায়, কেউ ভাজ করে রাখে। আমাদের সপ্তাহ ভিত্তি কাজের হিসাব হয়। আমার এখানে সুতি কাপড়, থ্রি-পিস ও সিল্ক শাড়ি ও লুঙ্গি পাওয়া যায়।
ঋতুর সঙ্গে পালটে যায় চাহিদার মায়াবী ছন্দ। গরমের দাবদাহে বাটিকের কদর ওঠে আকাশে, আর শীতের স্পর্শে কমে আসে ব্যস্ততা। তখন কর্মী সংখ্যাও কমে যায়। পুঁজি কম হলেই থমকে যায় চাকা, থেমে যায় রংতুলি।
তবুও তারা থামে না। তাদের স্বপ্ন মাটিতে পড়ে না। কমলপুরের এই ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিশ্বাস করেন, সরকারি প্রণোদনা, স্বল্প সুদের ঋণ কিংবা সামান্য সহায়তাও যদি পাশে দাঁড়ায়, তাহলে কুমিল্লার বাটিক আবার নতুন করে বিশ্বকে মোহিত করবে।
রঙে রঙে, নকশায় নকশায় বাংলার গর্ব হয়ে দাঁড়াবে এই শিল্প। যেমন দাঁড়িয়ে থাকে শেকড়ের প্রতি এক অটুট ভালোবাসা।
কুমিল্লা বাটিক সেন্টারের মহাজন রাশেদুল ইসলাম বাসসকে বলেন, আমার বাবা ৩৫ বছর আগে থেকে এই কারখানা শুরু করেন। আমি গত পাঁচ বছর ধরে এটার দায়িত্বে আছি। আমাদের এই ব্যাবসাটা প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। রোদ না থাকলে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। গরমকালের তুলনায় শীতকালে চাহিদা কমে যায়। তখন আমাদের কর্মীদের বেতন ভাতা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে কষ্ট হয়। সরকার যদি স্বল্প সুদে কিংবা সুদহীন ঋণের ব্যবস্থা করতো তাহলে শিল্পটি আরও বিস্তৃত হতো।
সবার সম্মিলিত পরিশ্রমে কর্মশালার ভেতরে তৈরি হয় এক অপার আনন্দের জোয়ার। পুরুষ-নারী, ছোট-বড় সবাই মিলে যেন এক পরিবার, বাঁচিয়ে রাখছেন কুমিল্লার বাটিক শিল্পের শেকড়। দিনভর পরিশ্রম আর রঙের খেলায় তারা শুধু কাপড় নয়, গড়ে তোলেন গৌরব, তুলে ধরেন বিশ্ব দরবারে বাঙালির সৃজনশীলতার চিরন্তন মহিমা।