শিরোনাম

চট্টগ্রাম, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : পবিত্র রমজান মাস উপলক্ষে দেশের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে ব্যস্ততা বেড়েছে। সেইসঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় আর শ্রমিকদের কর্মতৎপরতায় মুখর বাজারে কমছে প্রায় সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমানে বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম নিম্নমুখী রয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম রোজার দিন চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা যায়, এ বাজারে জমজমাট বেচাকেনা চলছে। সারাদেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসা হচ্ছে ট্রাকে, যেগুলো বাজারের সামনে সারি করে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশি রোজাদারদের ইফতারে ছোলার চাহিদা পূরণ করা হয় অস্ট্রেলিয়ার ছোলা আমদানির মাধ্যমে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাড়ে ৭ মাসে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাস হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৪ হাজার ৭৯৮ টন ছোলা। এর বাইরে আগের বছরের অবিক্রিত ছোলাও রয়েছে বাজারে।
ছোলার বড় আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, আমদানিকারকরা পাইকারদের কাছে প্রতি ছোলার মণ ২ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন। এ পর্যায়ে প্রতি কেজি ছোলা ৬৯ টাকা। সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির ছোলা ৭৪ টাকা। যদিও খুচরা বাজারের সঙ্গে পাইকারি বাজারের সামঞ্জস্য নেই। খুচরা বাজারে ৯০ থেকে ১১৫টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ায় ছোলার হারভেস্টিং মৌসুম শুরু হয় অক্টোবরে। চলে নভেম্বর পর্যন্ত। এবার বাংলাদেশে ডলার সংকট না থাকায় প্রচুর এলসি হয়েছে। তাই ছোলার বাজারে সংকট হওয়ার শঙ্কা নেই।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপ পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, প্রতিবছর দেশে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিকটন ছোলা আমদানি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বেশিরভাগ ছোলা আমদানি হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে। এ বছর আমদানি স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২ লাখ মেট্রিকটন ছোলা খালাস হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিছু ছোলা পাইপলাইনে আছে। সেগুলো দ্রুত খালাসের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘রোগ ও পোকামুক্ত, কোয়ালিটি নিশ্চিত হয়েই ছাড়পত্র দিচ্ছি আমরা। এবার ছোলার বাজারে অস্থিরতা বা দাম বৃদ্ধির কোনো সুযোগ থাকবে না।’
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হওয়া ছোলার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইতে ছোলা এসেছে ৪৯৮ টন, আগস্টে ৮৮৩ টন, সেপ্টেম্বরে ৮৭০ টন, অক্টোবরে ৫ হাজার ১৭৭ টন, নভেম্বরে ৪২ হাজার ৩৪৩ টন, ডিসেম্বরে ৫৭ হাজার ৪৬১ টন, এ বছরের জানুয়ারিতে ৭৯ হাজার ৭৭১ টন এবং ১-১৫ ফেব্রুয়ারি ৭ হাজার ৭৯৫ টন।
দেশে রমজানে খেজুরের চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ হাজার টন। এবার সরকার শুল্ক কমানোয় খেজুরের আমদানি বাড়ায় পাইকারিতে গত বছরের তুলনায় দাম কমেছে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রতি কেজি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১৭০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকায়।
খেজুরের অন্যতম পাইকারি বাজার নগরীর ফলমন্ডি এলাকার বিভিন্ন আড়তে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ফলমন্ডিতে প্রতি কার্টন (১০ কেজি) জাহিদি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়, সুপারি খেজুর প্রতি কার্টন ১ হাজার ৬০০ টাকায়। সুক্কাারি খেজুর প্রতি কার্টন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায়। আম্বার খেজুর প্রতি কার্টন (৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত।
এছাড়া মরিয়ম, মেডজুল, আজওয়াসহ বেশি দামি খেজুরের দাম এবার গত বছরের তুলনায় কিছুটা কম। গত বছর রমজানে আজওয়া খেজুর (৫ কেজি কার্টন) বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৫০০ টাকায়, এবার প্রতি কার্টন বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়। ভালো মানের মরিয়ম খেজুর প্রতি কার্টন বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার টাকায়, এবার বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। সাপাবি খেজুর গত বছর প্রতি কার্টন বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ২০০ টাকা, এবার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। মাশরুক বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা, এবার ২ হাজার টাকায়। নাগাল প্রতি কার্টন গত বছর বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৯০০ টাকা, এবার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ টাকায়।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে খেজুর আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে খেজুর আমদানি বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ২০২৫ সালে ১৮ হাজার ৪৩ টন খেজুর বেশি আমদানি হয়েছে। চলতি বছরের এই দেড় মাসেও আমদানি স্বাভাবিক ছিল।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ জাহেদী বলেন, ‘দেশে পেঁয়াজের মৌসুম চলছে, রমজানের পণ্যটির বেচাকেনা বেড়েছে স্বাভাবিক সময়ের চাইতে দ্বিগুণ। তবে সপ্তাহ ব্যবধানে চিনির দাম কেজিতে ৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।’
খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪৮-৫৫ টাকা, রসুন ১৭০-১৭৫ টাকা, আদা ১০৫ টাকা, আলু ১৫ টাকা, মটরডাল ৫১-৭৬ টাকা, মসুর ডাল ৭৫-৭৬ টাকা, ইন্ডিয়ান এলাচ ৪ হাজার ৬০০, গুয়েতামালা এলাচ ৪ হাজার টাকা, ইন্ডিয়ান জিরা ৬২০ টাকা, ইরানি জিরা ৮০০ টাকা, কিসমিস ৮০০ টাকা, হলুদ ২৫০-২৫৫ টাকা, দেশি মরিচ ২০০-২৩০ টাকা ও ইন্ডিয়ান মরিচ ৩৯০-৪০০ টাকা।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন জানান, বর্তমানে বাজারে ছোলা, মটর ও খেজুরসহ রমজান সংশ্লিষ্ট পণ্যের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে। বিশেষ করে ছোলার বাজারে আমদানির আধিক্য থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার দাম অনেকটাই কমেছে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে বৃহস্পতিবার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ান ছোলার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৮ থেকে ৭৫ টাকা। গত বছর রমজানের এক মাসে বিক্রি হয়েছিল ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। বর্তমানে মোটা মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৭৩ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৮৫ টাকায়। গত বছর চিকন মশুর ডাল বিক্রি হয়েছিল ১৪০ টাকায়। বর্তমানে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকায়। বর্তমানে মটর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৫৫ টাকায়। বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৯৪ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১১৪ টাকায়। বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৪০০ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার টাকায়। গত বছর প্রতি কেজি লবঙ্গ বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ২০০ টাকায়। এখন বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ১০০ টাকায়। এছাড়া জিরার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৫৫০ টাকায়।
অন্যদিকে পাম তেল মণ প্রতি (৩৭.২৩৭ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ৫ হাজার ৮০০ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ৫০০ টাকায়। বর্তমানে প্রতি মণ সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৩০০ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৬০০ টাকায়। প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫৫ টাকায়।
এছাড়া বর্তমানে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৬৮ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ৭০-৭৫ টাকায়। অন্যদিকে চীনা রসুন বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৩৫ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১৭০ টাকায়। চীনা আদা বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১৫ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১২৮-১৩০ টাকায়। এছাড়া বর্তমানে দেশি আদা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬৫ টাকায়। গত বছর বিক্রি হয়েছিল ১০০ টাকায়।
খাতুনগঞ্জের হামিদুল্লাহ মিয়া বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, বাজারে এখন নতুন দেশি পেঁয়াজ এসেছে। ফলনও ভালো হয়েছে। ফলে বাজারও কমতির দিকে। এছাড়া ভারতীয় পেঁয়াজও আছে। আদা-রসুনের দামও গত বছরের তুলনায় কম আছে।