বাসস
  ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৭:৪৭

 চরবিশ্বাসের নিভৃত চর থেকে প্রতিমন্ত্রীর আসনে নুরুল হক নুর 

শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল হক নুর। ফাইল ছবি

এনামুল হক এনা

পটুয়াখালী, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : জেলার প্রত্যন্ত নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের এক সাধারণ পরিবারের সন্তান নুরুল হক নুর এখন দেশের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। 

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) থেকে বিজয়ী গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। বহু প্রতিকূলতা পেরিয়ে চরবিশ্বাসের সেই সংগ্রামী তরুণ আজ রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হয়ে নিজ এলাকার মানুষের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার চরবিশ্বাস ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। নদীপথ ছাড়া সেখানে যাতায়াতের অন্য কোনো সহজ ব্যবস্থা নেই। এমন দুর্গম পরিবেশেই ১৯৯১ সালে জন্মগ্রহণ করেন নুরুল হক নুর। শৈশবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন তিনি। ১৯৯৩ সালে মাত্র আড়াই বছর বয়সে মাকে হারান। এরপর বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের স্নেহে বড় হতে থাকেন।

নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে তিনি স্থানীয় জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরে ২০০৮ সালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার গোলাম নবী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ২০১০ সালে মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর রাজধানীর উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তি হয়ে ২০১২ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) সম্পন্ন করেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন এবং ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। ওই আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন। এরপর থেকেই তিনি ‘ভিপি নুর’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত পান। 

একই সময়ে তিনি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ গণ অধিকার পরিষদ এর নেতৃত্বে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০২৩ সালে দলের কাউন্সিলে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে তিনি হামলা ও আইনি জটিলতার মুখে পড়েন। ২০১৯, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিভিন্ন আন্দোলন ও কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে তিনি একাধিকবার আহত হন এবং গ্রেপ্তার ও কারাভোগের অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন। এসব প্রতিকূলতা তাঁর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারেনি।

২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দেশের নির্বাহী দায়িত্বের অংশ হন। তাঁর এই অর্জন চরাঞ্চলের মানুষের জন্য এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল হক নুর বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী মারিয়া আক্তার একজন শিক্ষিকা। তাঁদের সংসারে দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে। পরিবার ও রাজনীতির মধ্যে সমন্বয় রেখে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে নুরের বাবা ইদ্রিস হাওলাদার (৮০) বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাঁর ছেলে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি কখনো ভাবেননি তাঁর ছেলে দেশের মন্ত্রী হবেন। 

তিনি আশা প্রকাশ করেন, নুর সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে জনগণের কল্যাণে কাজ করবেন। দুর্গম চরাঞ্চলের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানো নুরুল হক নুরের এই পথচলা দেশের তরুণ সমাজের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে।