বাসস
  ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:২২

৩০০ কোটি টাকার হাজী শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লি এখন বিরানভূমি 

মাদারীপুর-শরীয়তপুরে গৃহীত হাজী শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লি। ছবি: বাসস

\ বেলাল রিজভী \

মাদারীপুর, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ (বাসস) : প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুরে গৃহীত হাজী শরীয়তুল্লাহ তাঁতপল্লি প্রকল্প দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার কারণে কার্যত বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে।

প্রকল্পের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হলেও দ্বিতীয় ধাপ দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে। ফলে, পুরো প্রকল্প এলাকা অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে।

এতে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ উঠেছে এবং অন্যদিকে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে বলে জানতে পেরেছেন। তবে, শিগগিরই দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। কাজ শেষ হলে এই অঞ্চলে ব্যাপক উন্নয়ন হবে বলেও উল্লেখ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কুতুবপুর এবং শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায় প্রায় ১২০ একর জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রথম ধাপে ২৯৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট এবং পুরো প্রকল্প এলাকা ঘিরে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হয়। ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রথম ধাপের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বিশাল এলাকা মূলত বালুতে ঢেকে রয়েছে, আর কিছু অংশে বনজঙ্গল গড়ে উঠেছে।

কয়েকটি সাইনবোর্ড, একটি উদ্বোধনী ফলক এবং পরিত্যক্ত আনসার ব্যারাক ছাড়া সেখানে কোনো কার্যক্রমের চিহ্ন নেই। আনসার সদস্যদের জন্য নির্মিত টিনশেড ব্যারাকগুলোর দরজা-জানালা ভাঙাচোরা অবস্থায় রয়েছে।

শরীয়তপুর অংশে স্থানীয়রা জমির কিছু অংশে তরমুজ চাষ করেছেন। তবে, শিবচর অংশ পুরোপুরি অনাবাদী  পড়ে আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ১ হাজার তাঁতির জন্য দুইতলা আবাসনসহ কারখানা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রত্যেক তাঁতির জন্য ৬০০ বর্গফুট কারখানা স্থান এবং ৮০০ বর্গফুট আবাসন সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল।

এছাড়া প্রকল্পের নকশায় আন্তর্জাতিক মানের শোরুম, ডিজাইন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কাঁচামাল বিক্রয় কেন্দ্র, ব্যাংক, তথ্য ও সাইবার কেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, খেলার মাঠ, শিশু পার্ক, জলাধার এবং বনায়নের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

স্থানীয় কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, বালু ভরাটের কারণে এখানে ধান বা সবজি হয় না। তাই জমি ফেলে না রেখে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। কিন্তু যদি তাঁতপল্লি হতো, তাহলে এ এলাকার অনেক মানুষের কাজ পেত।

আরেক কৃষক জয়নাল হোসেন বলেন, ‘আমাদের ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আমরা টাকা পেয়েছি, কিন্তু এত বড় প্রকল্প এভাবে পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দা মামুনুর রহমান বলেন, ‘এটা শুধু একটি প্রকল্প নয়, পুরো অঞ্চলের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। দেড় বছর ধরে কাজ বন্ধ থাকায় মানুষ হতাশ।’

মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, এই তাঁতপল্লি বাস্তবায়িত হলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হতো। আমাদের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আধুনিক রূপ পেত। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।